মাহফুজ বিল্লাহ হক :: এটা সেই সময়ের গল্প, যখন পৃথিবীতে এত ট্র্যাভেল ব্লগার জন্ম নেয়নি, ইউটিউবে “এয়ারলাইনস রিভিউ” নামের জিনিসটা ছিল না, আর রায়ান এয়ারের ১০ পাউন্ডের টিকিটের রহস্য কেউ জানত না!
ডিসেম্বর ২০১০, চারদিকে বরফ পড়ছে, আমি নর্থ ইউরোপের এক হিমশীতল শহরে প্রথম শীতের অভিজ্ঞতা নিচ্ছি। ঠান্ডা এমনই যে, নিঃশ্বাস ফেললেই মনে হয়, বাতাস নাকের ভিতর জমে যাচ্ছে!
চারিদিকে স্নো ফল হচ্ছে! সেমিস্টার ব্রেকে লন্ডন থেকে বয়সে বড় এক কাজিন ফোন দিলো। “ভাই তুই ওই নর্থ ইউরোপে এই ঠান্ডায় কেনো মরতেছিস, আমি প্যারিস যাচ্ছি তোকে টিকিট পাঠাচ্ছি, তুইও চলে আয়!”
আমি যেখানে আছি সেখানে ডিসেম্বরে মাইনাস ২৫ তখন! ঠাণ্ডা যখন তখন বাড়ে কমে!
ইউনিভার্সিটি বন্ধ। টুকিটাকি কাজ থাকলেও ভয়ে সহজে একা ডরমেটরির বাইরে বের হইনা।
কাজিনের সাথে ফোনে কথা বলার পরদিনই ইমেইলে টিকেট পেয়ে গেলাম। দেখেতো চক্ষু চড়কগাছ, মাত্র ১০ পাউন্ড টিকিট এর দাম! এতো কমে কিভাবে টিকিট পাওয়া যায়? আমাদের লোকাল বাস যেটা ইউনিভারসিটি যায়, সেটার weekday’s এর টিকিটও তো এর থেকে বেশি!
যাই হোক, টিকিটে লেখা তারিখ অনুযায়ী যাত্রার আগে হাতে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে রওনা হলাম। গুগল করে দেখলাম, ছোট এক এয়ারপোর্ট থেকে প্লেন ছাড়বে। সিটি সেন্টার থেকে অনেক ভিতরে এটি! প্রায় দেড় ঘণ্টা ডাইরেক্ট বাসে করে বিনা টিকিটে যেখানে নিয়ে আমাকে সহ অন্যদের ছেড়ে দিলো, সেটা একটা নিখাদ গ্রাম ছাড়া আর কিছু না। বাস কোম্পানি এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষের।
সামনে ছোট্ট টার্মিনাল। বাসে বসে এতক্ষন বাইরের তুষার দেখছিলাম। হালকা ঠান্ডাও লাগছিল। এবার টার্মিনালের ভিতরে ঢুকে বেশ আরামই লাগলো। ভিতরে দেখি কাউন্টার গুলোর সামনে মানুষ কম-বেশি ছুটাছুটি করছে। তখনও বুঝিনি ছোট এই ডোমেস্টিক ফ্লাইটে এতো ছুটোছুটি কি কারণে! রায়ান এয়ারে ওঠা মানে শুধু প্লেনের টিকিট কাটা না, এটা যে এক রীতিমতো বেঁচে থাকার পরীক্ষা!
হাত ঘড়িতে দেখলাম আমার ফ্লাইট ছাড়তে তখনও অনেক দেরি। কিন্তু বোর্ডিং পাস নিয়ে চেকিং শেষ করে ভিতরে গিয়ে বসে থাকলে মন্দ হয় না। সাথে যেই লাগেজ ছিল সেটা আগে বেল্টে দিতে হবে। বোর্ডিং পাস, টিকিট নম্বর দিয়ে নিজেই ভেন্ডিং মেশিন থেকে নিয়ে নিয়েছি।
লাগেজ জমা দিতে গিয়েই খেলা শুরু।
“ওহ হো! লাগেজ তো ওজন মেপে জমা দিতে হবে!” গ্রাউন্ড স্টাফ এর কথা শুনে ওজন মেশিনে লাগেজ তুলতেই মুরুব্বি টাইপের গ্রাউন্ড স্টাফ বলল, “সরি, ১০০ গ্রাম বেশি, এভাবে পারবে না!”
১০০ গ্রাম নাকি!? আমি ওজন মেশিনে তাকিয়ে দেখি, সমস্যা আরো গুরুতর—আমার ব্যাগ ওভারওয়েট ৪.৫ কেজি! গ্রাউন্ড স্টাফ খুব মজা পাচ্ছে এমন মুখ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
২০ নাকি ২৫ কতো কেজি অ্যালাওয়েন্স ছিল সেটা এখন আর মনে নেই কিন্তু ১০০ গ্রাম বেশি হলেও নিতে দিবে না।
এখন কি করি?
এক সাইডে গিয়ে লাগেজ খুললাম। দেখি কি করা যায়।
জিনিস ফেলে দিতে ও মায়া হচ্ছে। আমি আবার সে যাত্রায় সাথে করে আমি আমার অমূল্য মাথার নিচে দেওয়ার জন্য শিমুল তুলার বালিশ লাগেজে ভরে নিয়েছিলাম! শক্ত বালিশ হলে আমি আবার ঘুমাতে পারি না! দেশে থেকে আসার সময়ও এটা সাথে করে এনেছিলাম। বালিশ যদিও খুবই পাতলা! সাথে আবার চাদর ও এনেছি। নিজের বালিশ আর চাদর সাথে থাকলে আমি দুনিয়ার যে কোনো জায়গায় ঘুমাতে পারি। তো কি আর করা, ফেলে দেওয়াতো যায়না। তার উপর আবার শীতের সময়।
হঠাৎ দেখি এক সাদা চামড়ার ইউরোপীয়ান মেয়ে সাইডে দাঁড়িয়ে তার লাগেজ খুলে এক প্যান্টের উপর আরো তিনটি প্যান্ট পড়ছে! পরেই যাচ্ছে..। সেটা দেখে আমার মাথায়ও বুদ্ধি খেলে গেলো। সাথে নিয়েছিলাম 3 টি ডেনিম প্যান্ট। এক এক করে সবগুলো পড়লাম এয়ারপোর্টের বাথরুমে গিয়ে। তারপর জ্যাকেট খুলে দুই টি শার্ট, দুই শার্ট এবং এক সুয়েটার চড়ালাম গায়ে। গলায় মাফলার মতো করে ভাঁজ করে বিছানার চাদর পেঁচিয়ে নিলাম গলায়। এবার আর বালিশ নিয়ে কোনো চিন্তা নেই!
সোয়েটারের নিচে পেটের উপর বালিশটা পাতলা করে ঢুকিয়ে নিলাম। বাকি সব কিছু গুছিয়ে তারপর লাগেজ বেল্টে দিতেই গো গো করে ছুটে চললো সে তার গন্তব্যে।
আমি এখন ৯০ কেজির এক বিশাল দানব! আসে পাশের লোক জন হয়তো আমাকে তাই মনে করছে। কিন্তু কে করে কার চিন্তা, আমি শক্ত পায়ে সিকিউরিটি চেকিং এর দিকে হেঁটে গেলাম।
সিকিউরিটি স্ক্যানারের মধ্যে ঢুকতেই রেড লাইট জ্বলে উঠলো!
বিপ! বিপ! বিপ!
পেছনের লোকজন কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এক বয়স্ক সিকিউরিটি অফিসার কাছে এসে বললেন,
“ইউ ওকে, সন?”
কিন্তু যত বারই সিকিউরিটি বক্স পার হচ্ছিলাম, ততবারই রেড লাইট জ্বলে উঠে মেটাল সাউন্ড দিতে লাগলো।
আমি ততক্ষণে ঘাবড়ে গেছি। না জানি কি হয় এবার!
তিন বার চেকিং প্যানেল পার হওয়ার পরেও যখন সিগন্যাল থামলো না, তখন বক্সের ওপার থেকে জেঠার বয়সী বিশাল দেহী সিকিউরিটির আরেকজন এগিয়ে এলো আমার সামনে। ততক্ষনে আমার হাত ঘড়ি, কোমরের বেল্ট, জুতা.. সবই খোলা হয়ে গিয়েছিল। সিকিউরিটির জেঠা মশাই তখন হাসি মুখে আমাকে বলল ডোন্ট ওরি সন, লেট মি চেক!
উনি হাত দিয়ে স্ক্যান করতেই মুচকি হেসে বললেন, “ওহ! ইউ আর ওয়্যারিং থ্রি প্যান্টস?! দিস ইজ হিলেরিয়াস! ইটস মেটাল বাটন ইস দা ক্রিমিনাল..! বাট ডোন্ট ওরি, ইউ মে গো!”
আমি তখন শুধু ভাবছিলাম, “এয়ারপোর্ট পার হলেই আবার একে একে সব খুলতে হবে!”
কিন্তু তারপরেও শান্তিতে নিঃশ্বাস ফেলে হাসি মুখে সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম। কিন্তু প্লেনে চড়ার আগে ও পরের ভোগান্তি তখনও শেষ হয়নি, এটা ছিল মাত্র শুরু।
পুরোটা এখন লিখতে গেলে অর্ধেক পুস্তক হয়ে যাবে, তাই বাকিটা আর এক দিন!
পুনশ্চ: ভালো লাগলে অবশ্যই ফিডব্যাক দিবেন, তাহলে বাকিটা শেয়ার করবো ইনাআল্লাহ।
© মাহফুজ বিল্লাহ হক