আহনাফ যাহিন : নয়কুড়ি কান্দার ছয়কুড়ি বিল টাংগুয়ার হাওরকে স্থানীয় ভাবে এই নামে ডাকা হয়। হাওরের আশপাশের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রের সাইনবোর্ডে এই নামের কথা লেখা আছ।এই নামের মধ্যে প্রকাশ পায় হাওরের বিশালত্ব।এই হাওর প্রায় ১২৬ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত। যা একে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি বানায়। টাংগুয়ার হাওরের নাম অনেক শুনেছি ইউটিউবে প্রায় সময় হাওরের ভিডিও সামনে আসতো দেখতাম নান্দনিক জলযানে মানুষজন হাওরে রাত্রিযাপন করছে। দেখতাম হাওরের পাখি, হাওরের মাঝখানের গাছপালা এবং আশপাশের গ্রামের দৃশ্য। এসব দেখে আমারও ইচ্ছা হতো একদিন হাওরে যাবো। এসব সুন্দর দৃশ্য নিজ চোখে দেখবো। আমাদের অনেকদিনের ইচ্ছা ছিল হাওরে যাওয়ার, অবশেষে দীর্ঘ অপেক্ষার পর হাওর ভ্রমণের সুযোগ আমাদের দরজায় কড়া নাড়ে। আমরাও হাওর ভ্রমণের পরিকল্পনা করি ।দিনক্ষণ, সহযাত্রী এসব ঠিক করি।৫ অক্টোবর’২৫ হাওরের উদ্দেশ্য রওয়ানা দিব বলে ঠিক করি। হাউজবোট, সহযাত্রীগণ এরইমধ্যে ঠিক হয়ে যায়।
আগ্রহের সাথে আমরা অপেক্ষা করতে থাকি। কবে আসবে ৫ তারিখ? কবে আমরা হাওরে যাবো।অবশেষে রওয়ানা দেওয়ার সময় চলে আসে।আমরা আগ্রহের সাথে ব্যাগপত্র গুছাই। কোনো জায়গায় যাওয়ার আগে ব্যাগ গুছানোর মধ্যে একটি আনন্দ আর উৎসব উৎসব ভাব কাজ করে। আমাদের সাথে যারা হাওরে গিয়েছিলেন তারা সবাই আমাদের পরিচিত। এমনকি আমরা যে হাউজবোটে গিয়েছিলাম সেই বোটের মালিক আমার বাবার ছাত্র শাহনূর আংকেল।আমরা ভোরবেলায় উঠে পড়ি। একটি কালো মাইক্রোবাস আমাদের তুলে নিয়ে যায়। কোথাও বেড়াতে যাবার সময় ঘুম থেকে উঠার মধ্যেও আনন্দ কাজ করে। আমিও আনন্দের সহিত সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পড়ি। কিছুটা তাড়াহুড়ো করে আমরা সবকিছু রেডি করে ফেলি। তারপর আমরা মাইক্রোবাসে উঠে পড়ি। এই মাইক্রোবাসটি আমাদের ঘাট পর্যন্ত নিয়ে যাবে। আমরা যাত্রা শুরু করলাম। তাহলে কি এতদিনের ইচ্ছা অবশেষে পূর্ণ হতে চলেছে? যাত্রাটাও আনন্দের ছিল। নতুন জায়গায় যাওয়ার আনন্দ আর কৌতুহল সবার মধ্যে ছিল। তাই এই দীর্ঘ যাত্রা আমাদের কাছে মোটেই ক্লান্তিকর ছিল না। পথে হাসি,গল্প আর আনন্দ করতে করতে সময় চলে গেল। একসময় আমাদের এই যাত্রার গাইড তিনিও গাড়িতে উঠলেন। আমরা সাতটার সময় গাড়িতে উঠি আর মাইক্রোবাস তার গন্তব্যস্থলে পৌঁছায় দশটার দিকে। তাহিরপুর ঘাটে অনেকগুলি হাউজবোট দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের জন্য আগে থেকে ঘাটে অপেক্ষা করছিল রাজার তরী হাউজবোট। বিভিন্ন হাউজবোটের নাম রঙ বিভিন্ন রকম। নামগুলো সুন্দর, নামের মতোই সুন্দর বোটের কারুকার্য।
আমরা বোটে পদার্পণ করলাম। বোটের বাইরের অংশে সুন্দর একটা দোলনা আছে প্রথমে দোলনাটাই চোখে পড়লো। আমরা আমাদের জুতা কার্পেটে রেখে নিজ রুম বুঝে নিলাম। প্রতিটি রুমে বড় একটা জানালা আছে যা খুললে বাইরে যা আছে তা দেখা যাবে। আমরা ছাদে উঠলাম ছাদটা সুন্দর করে সাজানো কয়েকটি গাছের টব আছে, ছাতা আছে বসার ব্যাবস্থা আছে। আমরা সবাই ছিলাম প্রচন্ড ক্ষুধার্ত। আমাদের বোটে সকালের নাস্তা দেওয়া হলো। নাস্তা হিসেবে ডিম আর খিচুড়ি ছিল। খাবারের স্বাদটাও অসাধারণ ছিল। চারপাশের থৈ থৈ পানি আর মাঝখানে বোটে বসে খাওয়াদাওয়া করা একটি নতুন অভিজ্ঞতা ছিল। আমরা প্রথমে যাবো ওয়াচটাওয়ারে। ওয়াচটাওয়ারের ভিডিও অনেক দেখেছি ওখানেই হয়তো মানুষজন গোসল করে। হাউজবোট রওনা দিল আশপাশে প্রচুর পানি আর পানি মনে হচ্ছে যেন সমুদ্রে এসে গেছি। একসময় আমরা ওয়াচটাওয়ারের আশপাশে চলে আসি এইসময় কয়েকটা ডিংগি নৌকা আমাদের বোট ঘিরে রাখে। ওয়াচটাওয়ারে যেতে হলে আমাদের ডিংগি নৌকা দিয়ে যেতে হবে। ওয়াচটাওয়ারের এলাকায় হাউজবোটের চলাচল নিষিদ্ধ। অনেক ছোট বাচ্চাদের দেখলাম অনায়াসে নৌকা চালাচ্ছে। পানিতে ভাসমান নৌকা চালানো তাদের কাছে কোনো ব্যাপারই না। এইসব কাজ তারা অনায়াসে করতে পারে। আশপাশে এরকম অনেক শিশু কিশোরকে দেখলাম যারা নৌকা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
তখন প্রচুর গরম ছিল আর ওয়াচটাওয়ারে যাওয়ার জন্য কারোর তেমন আগ্রহ ছিল না,তাই আমরা ওয়াচটাওয়ারকে ফেলে রেখে টেকেরঘাটের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। আমাদের বোট চলতে থাকে। মাঝে মাঝে আমরা, আমাদের বোটের মতো কয়েকটা বোট দেখতে পাই। বোটের ছাদে উঠলে মনে হবে যেন জাহাজে করে কোথাও যাচ্ছি। আশপাশে অনেকগুলো গ্রাম দেখা যায়। গ্রামের ছোট ছেলেরা সাতার কাটছে মহিলারা কাপড়, বাসন ধোচ্ছে এইসব দৃশ্য দেখতে দেখতে আমরা আমাদের গন্তব্যের কাছে চলে আসি। আমাদের বোট টেকেরঘাটে ভিড়ানো হয়। আমরা সবাই এক এক করে বোট থেকে নামলাম। আশপাশের দোকান থেকে কিছু পানীয় বা দই খেয়ে ক্লান্তি নিবারণের চেষ্টা করলাম। লাকমাছড়ায় যাওয়া যায় মোটরসাইকেল অথবা চান্দের গাড়ি দিয়ে। আমরা একটি চান্দের গাড়ি ভাড়া করলাম, একটা গাড়িতে সবার জায়গা মোটামুটি হলো। এই ধরণের গাড়ির উপরের অংশ খোলা থাকে, চান্দের গাড়ি পাহাড়ি অঞ্চলে দেখা যায়। এই গাড়িতে যাত্রা করার মজাই আলাদা।দাড়ালেই বাহিরের দৃশ্য দেখা যায়, দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আশপাশ দেখতে দেখতে ঘোরা যায়। গাড়ি ঠিকঠাক মতোই চলছিল রাস্তার অবস্থা বেশি ভালো না। একটু পরে কাদায় গাড়ি আটকে যায় পরে আমরা নেমে আসি ।আমরা কিচ্ছুক্ষণ অপেক্ষা করছিলাম দেখার জন্য যে, গাড়ি আসবে নাকি, শেষ পর্যন্ত গাড়ি আর আগাতে পারেনি। আমরা উপায় না দেখে হেটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। আশপাশের গ্রামীণ পরিবেশ আর মাঝখানে একটি রাস্তা সেই রাস্তাই আমাদের নিয়ে যাবে আমাদের কাংখিত গন্তব্য লাকমাছড়ায়। ছোটদের কোনো ক্লান্তি নেই তারা অক্লান্ত ভাবে ছুটছে। রাস্তায় হাটতে হাটতে কেউ কেউ ক্লান্ত হতে লাগলো পথটি অনেক বড় তবুও সবাই লাকমাছড়া দেখার জন্য হাটতে লাগলো। অবশেষে দীর্ঘ একটি পথ পায়ে হেটে আমরা অবশেষে লাকমাছড়ায় পৌছাই। লাকমাছড়ার একদম কাছে ভারতীয় সীমান্ত এখান থেকে দেখা যায় মেঘালয়ের পাহাড়। পাহাড়ের উপর থেকে সাদা সাদা মেঘ ভেসে বেড়ায় মনে হবে যেন পাহাড় থেকে মেঘ বের হচ্ছে। পাহাড়ের মাঝখানে একটি ব্রিজ আছে। ব্রিজের ডানে বামে ও পিছন তিন দিক দিয়ে গহীন অরণ্যে ঢাকা। পাহাড় আর মাঝখানের ব্রিজের ছোট একটি অংশকে বেশ ভূতুড়েই লাগছিলো। পাশ দিয়ে হিমশীতল পানির ছড়া প্রবাহিত হচ্ছে। ঠান্ডা পানিতে পা ভিজিয়ে আমরা আমাদের ক্লান্তি কিছুটা দূর করলাম। এই জায়গায় বিজিবির একটা সাইনবোর্ড চোখে পড়বে যেখানে পর্যটকদের সতর্ক করে দেওয়া হয় এটি বাংলাদেশের শেষ সীমানা এটি অতিক্রম করা নিষেধ। সব পর্যটকরা এউ সাইনবোর্ড অতিক্রম করে সামনে এগিয়েছে দেখে আমরাও এগিয়ে গেলাম, এত কষ্ট করে যখন আমরা লাকমাছড়ায় এসেছি তখন কেন পুরোটা না দেখে যাবো? এখানে খুব একটা পাথর নেই বেশিরভাগই চুরি হয়ে গিয়েছে। ভারতীয় পাহাড় থেকে একটা ঝর্ণা প্রবাহিত হয়েছে যেখান থেকে ছড়ার উৎপত্তি। কিছু দূরে পাহাড়ের নিচের দিকে কিছু বিজিবি অফিসার বসে টহল দিচ্ছিলেন, তার কিছু কাছেই প্রাচীণ একটা গাছ আছে। ভাবতেই অবাক লাগে আমরা বাংলাদেশের সীমানা অতিক্রম করে নো ম্যান্সল্যান্ডে গিয়েছিলাম। আমরা লাকমাছড়াকে বিদায় জানিয়ে আবার বোটের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই।
এখন আর হেটে নয় আমরা এবার টমটমে করে ফিরি। ফিরার সময় বারবার চোখ যাচ্ছিল সুবিশাল পাহাড়ের দিকে। ফিরতে ফিরতে অনেক বেলা হয়ে গেল বিকালে আমরা দুপুরের খাবার বোটের ছাদে খেলাম। বোটটা সারারাতের জন্য ঘাটেই থাকবে। দুপুরে আমরা বোয়াল মাছের তরকারি খেলাম। আমাদের কাছাকাছি আরও কয়েকটা বোট বাধা আছে। খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ করে আমরা যাবো নীলাদ্রি লেকে। আমরা একটু বিশ্রাম নিয়ে রওয়ানা দিলাম বের হতে হতে প্রায় পাচটা বেজে গেল। একটু দূরে যেতেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল, আমরা তাড়াতাড়ি একটা দোকানের নিচে আশ্রয় নেই। কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি থেমে যায়, আমরা আবার হাটা শুরু করি। আলো ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে একটু পর সন্ধ্যা হবে। কিছুক্ষণ এভাবেই যেতে আবার হুট করে বৃষ্টি শুরু হয়। আমরা আবার দৌড়ে এসে একটা চায়ের টংয়ে বসি। বৃষ্টি এখন বেশ জোড়েই পড়ছে, মনে হয় না খুব তাড়াতাড়ি বন্ধ হবে। তাহলে কি আমরা শেষ পর্যন্ত লেক না দেখে ফিরবো? কিছুক্ষণ পর আলো নীভে যাবে তখন লেকের সৌন্দর্য্য ঠিকমতো উপভোগ করা যাবে না।আমরা যে টংয়ে ছিলাম সেই টংয়ে শুধু রং চা বিক্রি করে কেউ কেউ চা খাচ্ছিল আর বাকিরা চিন্তিত মনে বাইরের দিকে তাকাচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর বৃষ্টির মাত্রা কমে এলো। এখন হয়তো যাওয়া যাবে। আমরা আর বৃষ্টির কথা চিন্তা না করে সামনে এগিয়ে চললাম। লেকটা তার নামের যথার্থতা বহন করে। লেকের পানি দেখে মনে হবে নীল সমুদ্রের পানি। লেকে ঘোরার জন্য নৌকাগুলোও সুন্দর রং বেরং এর রংয়ে সাজানো। নৌকাগুলো ফুলের মালা দিয়ে সাজানো। আমরা এমনি একটা নৌকায় উঠে পড়ি সন্ধ্যা আকাশের রং আর লেকের পানির নীল রঙ মিশে একাকার হয়েছে। তখনো ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছিল। ভারতীয় পাহাড় খুব কাছ থেকে দেখা যায়। পাহাড়কে বিশালাকৃতির দানবের মতো লাগছিলো, যেন দানবটি তার দুই হাত প্রসারিত করে কাউকে আহবান জানাচ্ছে। ঘন জংগল দিয়ে আচ্ছাদিত পাহাড়টির নিচে আছে বড় চুনাপাথর। কয়েকটি চুনাপাথরের আকার দেখে বিস্মিত হয়েছি। সীমান্তে সন্ধ্যা হলে সারিবদ্ধ লাইটগুলো জ্বলতে শুরু করে। চারপাশের অন্ধকার আর ভয় জাগানিয়া পরিবেশ মুহুর্তের মধ্যে চলে যায়। চারপাশ লাইটের আলোয় আলোকিত হয়। লেকের মাঝখানে ছোট আর মাঝারি আকৃতির দ্বীপ আছে। যদিও আমরা দ্বীপে নামিনি। লেকের মাঝখানে থাকলে মনে কোনো দুঃখের চিন্তা আসবে না, চারপাশের চেনা জগৎকে সুন্দর মনে হবে। তখন কাছের পাহাড় থেকে ভেসে আসা লাইটের আলোকেও কম সুন্দর লাগবে না।
নীলাদ্রি লেকের মায়াবী ঘোর কাটিয়ে আমরা ডাংগায় আসি। ঘাটের আশপাশে কয়েকটা দোকান আছে যেখানে ভারতীয় পণ্য পাওয়া যায়। এখন আমরা আবার বোটে যাবো সারারাত এখানেই কাটাবো। আমাদের চারপাশের বোটে রং বেরং এর লাইট জ্বালানো হচ্ছে। চারিদিকে একটা উৎসব উৎসব আমেজ তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন বোট থেকে গানের শব্দ ভেসে আসছে। কেউ কেউ বোটের ভিতর বসে পুরোনো দিনের গল্প করছে আবার কেউ বাইরে গিয়ে কেনাকাটা করছে ছোট বাচ্চারা তাদের মতোই ছুটছে যেই ছোটাছুটির কোনো শেষ নেই। মাঝে দমকা বাতাসে পুরো বোট কাপিয়ে দিয়ে যায়। অনেকক্ষণ ধরেই বৃষ্টি আসি আসি করছিলো একটু পর বৃষ্টি আসে। বৃষ্টিতে বোটের ছাদ আর বোটের বাহিরের দিক ভিজে যায়। একসময় রাতের খাবার পরিবেশন করা হয় খাবারের মেনুতে সবচেয়ে আকর্ষণীয় খাবার ছিল হাসের মাংস। হাসের মাংস খেতে দারুণ ছিল। আহারাদি শেষে আমরা যে যার বিছানায় চলে যাই। পানিতে ভাসমান অবস্থায় ঘুমানোর অভিজ্ঞতা এই প্রথম। অভিজ্ঞতাটাও বেশ সুখকর ছিল মাঝে এক পাল দমকা হাওয়ায় বোটকে কাপিয়ে চলে যায়। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে বিছানায় যেতে কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়লাম।
ঘুম ভাংলো সকাল সকাল। ঘুম থেকে উঠে দেখি বোট যাত্রা শুরু করে দিয়েছে। ইঞ্জিনের শব্দে পুরো বোট কাপছে। কেউ কেউ আগে থেকে ঘুম থেকে উঠে গিয়েছিল। আবহাওয়াটা ঠান্ডা ও আরামদায়ক। ঘুম থেকে উঠে জানতে পারি এখন আমরা যাদুকাটা নদীর উপরে আছি। যাদুকাটা নামটার মধ্যেই লুকিয়ে আছে নান্দনিকতা। এই নদী কি কোনো এককালে জাদুর প্রভাব থেকে মানুষকে মুক্তি দান করেছিলো, যার ফলে লোকজন এই নদীর অলৌকিক প্রভাব মেনে নিয়ে এই নামকরণ করেছে? সূর্যের প্রখর রোদ তখনো পড়েনি, তাই আশপাশের দৃশ্য বেশ স্পষ্ট দেখা যায়। আশপাশে অনেক গ্রাম আছে যেখানে মানুষের জীবন অনেক কষ্টসাধ্য যেখানে মানুষ প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে বেচে থাকে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা দেখা আমার পছন্দের কাজ তাই নদীর ধারে জনগোষ্ঠীর জীবন যতটুকু দেখা যায় ততটুকুই প্রাণ ও মন ভরে দেখলাম। ছোট শিশুরা বিশাল স্রোতস্বিনীতে ভাসছে তারা বাল্যকাল থেকেই সাতারে পটু। অনেকক্ষণ হতেই দেখছি অনেকগুলো পাহাড় যত কাছে যাচ্ছি ততই দিনের মতো স্পষ্ট হচ্ছে তারা। পাহাড়গুলো যেন ধীরে ধীরে তার বিশালত্ব প্রকাশ করছে। দূর থেকেই আবছাভাবে পাহাড় দেখেই মন বিস্মিত হয়েছিল একটু কাছে আসতেই আরো বিস্মিত হয়ে আবার দেখলাম পাহাড়কে।
এবারে আমরা যাবো শিমুল বাগানে। বোট ঘাটে ভিড়ানো হলো আমাদের কাছেই আরো কয়েকটা বোট থামলো। কয়েকটা বোট থেকে গানের কন্ঠ ভেসে এলো। শিমুল বাগানে আমিও আগে গিয়েছি, আজ আবার আসলাম। তখন প্রচুর শিমুল ফুল ছিল এখন নেই, শিমুল ফুলে সারা বাগান ছেয়ে ছিল। তখন মনে হয়েছিল ভিনদেশী কোনো উদ্যানে এসেছি। আজকে এসে বৃৃষ্টিস্নাত বাগান দেখলাম। আমাদের বিশেষ আকর্ষণ ছিল ঘোড়া। এখানে নানা রংয়ের ঘোড়া পাওয়া যায়। ঘোড়ার গায়ে আবার বিভিন্ন ফিতা,ঘন্টা আছে। ঘোড়ায় উঠার জন্য আমার ছোট ভাই সবচেয়ে বেশি আগ্রহী ছিল। যদিও একটু একটু ভয় নিশ্চয় ছিল, তবে প্রবল ইচ্ছাশক্তির সামনে তার মনের হালকা ভয় যা ছিল তা কাবু হয়ে যায়। আমরা অবশেষে আমাদের বহুল কাংখিত ঘোড়ায় উঠলাম। ঘোড়ার রং ছিল ধূসর। ঘোড়া চালাতে আমাদের সাহায্য করেছিলেন ঘোড়ার গাড়োয়ান, উনি আমাদের ঘোড়ার পাশে সবসময় ছিলেন। ঘোড়াটির আবার একটি নামও আছে নাম হলো সূর্যলাল। ফিতা ডানে টানলে ডানে যায় আর বামে টানলে বামে যায়, আর ঘন্টার ঝনঝন শব্দে এগিয়ে যায়। ঘোড়ায় চড়ে নিজেকে মধ্যযুগের রণক্ষেত্রের কোনো এক ক্লান্ত যোদ্ধার কথা মনে হচ্ছিল, যে তার নিজের জাতিকে রক্ষার দায়িত্ব তার কাধে নিয়ে শত্রু নিধনের জন্য এগিয়ে যাচ্ছে।বাস্তবে ফেরা যাক, আমার মাঝে মাঝে ভয়ও লাগছিলো এই বুঝি আমি পড়ে যাবো। ভয়, আনন্দ, উত্তেজনা সবগুলো অনুভূতি একসাথে অনুভব করার পর আমাদের ঘোড়ার যাত্রা শেষ হলো। ঘোড়া থেকে নেমে আমরা বাগান ঘোরা শুরু করলাম। বাগান জুড়ে বিভিন্ন রকমের ঘোড়া। কোনো ঘোড়া বাধ্য প্রাণীর মতো মনিবের পাশে শান্ত হয়ে দাড়িয়ে আছে কোনো ধরণের তেজ নেই তার চোখের চাহনিতে। কিছু কিছু ঘোড়া দেখলাম স্বাধীনচিত্তে বাগান জুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে মনের আনন্দে চিবিয়ে চিবিয়ে ঘাস খাচ্ছে। এখানে ছোট ছোট শিশুরাও ঘোড়া চালিয়ে জীবিকা চালায় কেউ কেউ পর্যটকদের ছবি স্মার্টফোনে তুলে দেয়, এরকমই একজনের সাথে দেখা হলো সে আমাদের সব ছবি মোবাইলে তুলে দিল। বাগানের গাছগুলো সারিবদ্ধ। ছবি তোলার শখ মিটিয়ে আমরা বাগানকে বিদায় জানিয়ে চলে আসি বোটে।
এবার যাবো বারিক্কি টিলায়,টিলা এখান থেকে বেশি দূরে নয় টিলায় যাওয়ার পথে বোটে গানের আসর বসলো গান শুনতে শুনতে আমরা গন্তব্যস্থলে পৌছাই। এখান থেকে আমরা টিলায় উঠবো আমাদের মধ্যের কেউ কেউ মোটরসাইকেল বা কেউ পায়ে হেটে টিলায় উঠি।হেটে হেটে টিলায় উঠা সত্যিকার অর্থে খুবই কষ্টকর, সিড়ি দিয়ে ধাপে ধাপে টিলায় উঠতে হয়।টিলার চূড়ায় যখন উঠি তখন বুঝতে পারি এত ঘাম ঝরিয়ে উঠা সার্থক হয়েছে। যে পাহাড়কে এতক্ষণ ধরে আবছা আবছা ভাবে আমাদের কাছে ধরা দিচ্ছিল সেই পাহাড়কে পরিপূর্ণভাবে স্বচক্ষে এখন দেখতে পারলাম। এখানেও দেখি দুই একটা ঘোড়া আছে। ঘন সবুজ জংগল দিয়ে আচ্ছাদিত পাহাড়টি মাত্র কয়েক পা আগালেই নিজ দেশ নিজ জগৎকে বিদায় জানিয়ে চলে যাবো নতুন কোনো দেশে। টিলার চূড়ায় একটু পর থেকে শুরু হয়ে গভীর আরণ্য আর নতুন দেশের মানচিত্র। টিলায় একটা ওয়াচটাওয়ার আছে আমরা ওয়াচটাওয়ারে ছবি টবি তুললাম। টিলার উপরে আখের রসও বিক্রি হয়, আমরা আখের রস খেয়ে তৃপ্ত হলাম। দূর থেকে ঝর্ণাও দেখা যায় আমরা টিলা থেকে নেমে আসি। এই টিলায় আসার কারণে আমরা গ্রামীণ জীবন একেবারে কাছ থেকে দেখতে পেয়েছি।
এই টিলা ভ্রমণের মাধ্যমে আমাদের সফরের ইতি ঘটলো। এখন আমরা বোটে ফিরে যাবো, আমাদের যদিও যাদুকাটা নদীতে নামার ইচ্ছা ছিল কিন্তু পানি বেশি পরিস্কার থাকার না কারণে আমরা আর নামতে পারিনি। এই দুইদিনে আমরা পানির উপর বসবাস করার যে অভিজ্ঞতা তা কিছুটা হলেও পেয়েছি, এই দুইদিন আমরা সবাই একটি পরিবারের মতো ছিলাম। বইয়ে জাহাজে ভাসমান সওদাগর ও দুর্ধর্ষ জলদস্যুদের নিয়ে পড়েছি এইসব বর্ণনা পড়ে আমার মনে হয়েছিল সত্যিকার অর্থে পানির উপর ভাসমান থাকার অভিজ্ঞতা আসলে কি-রকম এই সফর আমাকে সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। যাদুকাটা নদীর যাদুময়ী মোহ কাটানো এত সহজ না তাও আমাদেরকে বাধ্য হয়ে যাদুকাটাকে বিদায় জানিয়ে ডাংগায় আসতে হবে। দুপুরে আমরা শেষবারের মতো এই বোটে খাওয়া দাওয়া করলাম খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ হলে বোট ঘাটের উদ্দেশ্য রওয়ানা দেয়, ঘাটে যেতে বেশিক্ষণ লাগেনি। ঘাটে ফিরে আমরা আগের কালো মাইক্রোবাসে উঠে হাওর বিলাসে যাই। হাওর বিলাসে দাড়ালে হাওর দেখা যায়। মাঝে মাঝে কয়েকটা ছোট নৌকাও দেখা যাবে। এই স্থানটা হাওর দর্শনের কথা মাথায় রেখে করা হয়েছে এখানে হালকা কিছু খেয়ে যাত্রার আনুষ্ঠানিক ইতি টানা হলো। হাওর বিলাসে দাঁড়িয়ে যত দূর দেখা যায় তত দূরই হাওরের বিস্তৃতি। হাওর বিলাসে সবাই সবাইকে বিদায় জানিয়ে আমরা আবার কালো মাইক্রোবাসে উঠি। এখন আমরা চলে যাবো নিজ নিজ আপন ঘরে কাল থেকে আবার শুরু হবে রুটিনমাফিক জীবন। বোটে যতক্ষণ ছিলাম এই অঞ্চলের হাওয়া পানির শব্দ আমাকে অন্য এক জগতে নিয়ে গিয়েছিল আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল থাকবে এই সফর।
আহনাফ যাহিন, অষ্টম শ্রেণি,ব্লুবার্ড স্কুল এন্ড কলেজ
নিজস্ব সংবাদ : 















