শেখ খায়রুল কবির : গতকাল এইচএসসি-২০২৬ এর ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। সম্মিলিত ১১ বোর্ডের পাশের হার ৫২.১২%, আর সাধারণ ৯টি বোর্ডে ৫১.৬২%। বিগত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
একটি পরীক্ষার ফলাফল কখনোই কেবল কিছু শিক্ষার্থীর সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার পরিসংখ্যান নয়; বরং এটি একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, পাঠদান পদ্ধতি, মূল্যায়ন কাঠামো এবং সামগ্রিক শিক্ষানীতির কার্যকারিতারও প্রতিফলন।
এইচএসসিতে পাশের হার ৫২ শতাংশে নেমে আসার খবর তাই নিছক একটি পরিসংখ্যান নয়। এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে জমে থাকা অসংগতি, দুর্বলতা ও দীর্ঘদিনের নীতিগত সংকট নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।
প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি, পাশের হার কমে যাওয়াই শিক্ষার মান কমে যাওয়ার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। বরং কখনো কখনো কঠোর ও নিরপেক্ষ মূল্যায়নের কারণেও পাশের হার কমতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শেখার সক্ষমতা কি বাড়ছে, নাকি আমরা দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষায় ভালো ফল করাকেই শিক্ষার সাফল্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছি?
২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১১টি শিক্ষা বোর্ডে সম্মিলিত পাশের হার ৫২.১২ শতাংশ। গত বছর এই হার ছিল ৫৮.৮৩ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরেই কমেছে ৬.৭১ শতাংশ পয়েন্ট। ২০০৪ সালের পর এমন নিম্ন পাশের হার আর দেখা যায়নি। অন্যদিকে, সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর পাশের হার ৫১.৬২ শতাংশ।
এই ফলাফলকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর পেছনে রয়েছে কয়েকটি কাঠামোগত প্রশ্ন:
প্রথমত, শিক্ষার ভিত্তি কতটা মজবুত? প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীরা কি সত্যিকার অর্থে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান, ভাষাগত দক্ষতা, গাণিতিক যুক্তি ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা অর্জন করছে? নাকি পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার কৌশলই তাদের শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে?
দ্বিতীয়ত, শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষের সংকট। পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকা, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার ঘাটতি, প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতা এবং শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান না হওয়া—এসব সমস্যা দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে ইংরেজি ও তথ্যপ্রযুক্তির মতো বিষয়ে দুর্বলতা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বড় সতর্কসংকেত।
তৃতীয়ত, মূল্যায়ন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা। একদিকে পরীক্ষার খাতা নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করতে হবে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীর প্রকৃত যোগ্যতা যথাযথভাবে পরিমাপ করতে হবে। পাশের হার বাড়ানোর জন্য নম্বর বাড়ানো যেমন অনৈতিক, তেমনি মূল্যায়নে অসংগতি থাকলেও তা গ্রহণযোগ্য নয়।
চতুর্থত, শিক্ষায় বৈষম্য, শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সামর্থ্যবান ও নিম্ন আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুযোগের যে ব্যবধান রয়েছে, তা কমানোর কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোভিড-পরবর্তী শিক্ষার ঘাটতি, ধারাবাহিক শিক্ষাবিঘ্ন এবং দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রভাব বিবেচনায় নিতে হবে। ফলাফলের পতনের কারণ অনুসন্ধানে এসব বিষয়কে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে যাচাই করা জরুরি।
শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার দায় কেবল শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। একজন শিক্ষার্থী কেন শিখতে পারছে না, কেন শ্রেণিকক্ষে তার শেখার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, কেন একজন শিক্ষক পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়ে পাঠদান করতে পারছেন না, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা, শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, শিক্ষা প্রশাসনের জবাবদিহি এবং শিক্ষার বাজেট বরাদ্দ, প্রতিটি ক্ষেত্রের কার্যকারিতা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
আমি মনে করি, কয়েকটি উদ্যোগ নেয়া জরুরি:
– জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক শিখন-ঘাটতি নিরূপণে একটি নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ গবেষণা পরিচালনা।
– শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও পাঠদানের মান পর্যবেক্ষণ।
– মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে চিন্তা, বিশ্লেষণ, সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা।
– শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য কমানো।
– পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন ও ফলাফল পুনর্নিরীক্ষণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
– শিক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি, গবেষণাভিত্তিক ও ধারাবাহিক জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে বিষয়টিকে আমি কেবল পরীক্ষার ফলাফলের অবনতি হিসেবে দেখতে চাই না। বরং এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার আত্মসমালোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ভালো ফলাফল মানেই মানসম্মত শিক্ষা নয়, আবার খারাপ ফলাফল মানেই শিক্ষার্থীদের মেধার সংকট নয়। একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হয় কতজন জিপিএ-৫ পেল, কিংবা কত শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করল, তা দিয়ে নয় বরং শিক্ষার্থীরা কতটা জ্ঞান অর্জন করল, কতটা যুক্তিবাদী হলো, কতটা মানবিক হলো এবং বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কতটা সক্ষম হয়ে উঠল, তা দিয়ে।
আমরা কি শুধু পরীক্ষায় পাস করা প্রজন্ম তৈরি করতে চাই, নাকি জ্ঞান, দক্ষতা, বিবেক ও সৃজনশীলতায় সমৃদ্ধ একটি প্রজন্ম গড়ে তুলতে চাই?
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দায় রাষ্ট্রের, শিক্ষানীতি নির্ধারকদের, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের, শিক্ষক-অভিভাবকদের এবং আমাদের সবার।
শিক্ষাকে বাঁচাতে হলে প্রথমে শিক্ষাব্যবস্থার অসংগতিগুলো স্বীকার করতে হবে। কারণ সমস্যাকে আড়াল করে কোনো জাতির শিক্ষার ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা যায় না।
শেখ খায়রুল কবির
সাবেক শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
নিজস্ব সংবাদ : 














