ঢাকা ০১:২৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নতুন সরকার এবং পর্যটনের প্রত্যাশা

জামিউল আহমেদ :: অভিনন্দন! নতুন নির্বাচিত সরকারকে। পর্যটনের পক্ষ থেকে নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানানো অনেকটা রেওয়াজ হলেও এবার তাতে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। আর তা হচ্ছে প্রত্যাশার আকাশচুম্বীতা; যার সাথে পর্যটনের অস্তিত্বের প্রশ্ন জড়িত। কেন না ব্যাপক সম্ভাবনা নিয়ে যাত্রা শুরু করা পর্যটনকে আজ চুয়ান্ন বছরে এসে প্রত্যাশা পূরণ দূরে থাক উপরন্তু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে এই শিল্পটি আদৌ থাকবে কি থাকবেনা। এমন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সদাশয় সরকারকে আগেকার সরকারগুলোর মত কোন ভনিতা না করে সুচিন্তিত ও সঠিক সিদ্ধান্তে আসতে হবে যা দ্বারা হয় পর্যটন তার অপার সম্ভাবনা নিয়ে ব্যাপকভাবে ঘুরে দাঁড়াবে নাহয় ধীর ধীরে হারিয়ে যাবে আমাদের অভিশাপ দিয়ে।

তবে আশার কথা, নতুন সরকারকে অনেক ব্যাপারেই ইতিবাচক এবং বাস্তববাদী মনে হচ্ছে। এজন্য সরকারকে ভেবে দেখতে হবে এক কৃষি ছাড়া আমাদের বিকল্প ও নিজস্বতা আছে তেমন কিছু নেই। এক্ষেত্রে কৃষির পরেই স্থান দেয়া যায় এই পর্যটনকে যা হারিয়ে যাবার ভয়তো নেই উপরন্তু বিকশিত হবে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে।

কেন না অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থান, দারিদ্র দূরীকরণ, সংস্কৃতি সংরক্ষণ, পরিবেশ রক্ষা, টেকসই উন্নয়ন এগুলো হচ্ছে পর্যটনের প্রধান সাফল্য যা বিশ্বসেরা। আবার যে কৃষক, নারী এবং তরুণদেরকে সামনে রেখে এই সরকার তার পরিকল্পনার ছক করে এগুচ্ছে তাদের জন্য এই পর্যটন হতে পারে সত্যিই মোক্ষম। কেন না গোটা বিশ্বে মোট যে কর্মসংস্থান তার প্রতি দশজনের একজন এবং দ্রুত কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রতি চারজনের একজন হচ্ছে এই পর্যটন শিল্পের মানুষ। আবার পর্যটন শিল্পে নারী এবং তরুণদের হিস্যা হচ্ছে যথাক্রমে শতকরা ৬০-৬৫ এবং ১৫-২৫ ভাগ। আবার কৃষির সাথে পর্যটনের সরাসরি সম্পর্ক থাকায় প্রান্তিক কৃষকের জন্যও রয়েছে বিস্তর সুযোগ। এছাড়াও আমাদের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে পর্যটন সম্পদ এবং মানব সম্পদের পর্যাপ্ততা। যেজন্য প্রশ্ন হলো অতীত সরকারগুলো ব্যর্থ বলে এই সরকার কেন এই অপার ও অফুরন্ত সম্ভাবনাকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজে লাগাবেনা? এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর রয়েছে সরকারেরই কাছে যা মোকাবেলা করতে হবে বাস্তবতার নিরিখে এবং আল্লাহর দেয়া নেয়ামত তথা প্রকৃতির অপার দানকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগিয়ে।

অবশ্য এজন্য সরকারকে প্রথমেই সত্যানুসন্ধান করে দেখতে হবে আমাদের অতি সম্ভাবনাময় পর্যটনের এই দৈন্যদশার জন্য কারা দায়ী এবং কি জন্য এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। তবে তা হতে হবে বাস্তবতার নিরিখে সুচিন্তিত এবং সুবিবেচনাপ্রসূত। কেন না বাস্তব সত্য হচ্ছে পর্যাপ্ত পর্যটন সম্পদ এবং মানব সম্পদ থাকার পরও এমন অমিত সম্ভাবনার পর্যটন শিল্পটি তার প্রত্যাশিত উন্নয়নের ধারা থেকে ছিটকে পড়ার কারণ চিহ্নিত করা গেলে সরকারের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ হবে। এজন্য প্রথমেই দেখতে হবে এই দীর্ঘ সময়ে সম্ভাবনাময় পর্যটনের জন্য ন্যুনতম কি কি প্রয়োজন ছিল যা সে পায়নি। উপরন্তু পেয়েছে বাগাড়ম্বর, অবহেলা, অসততা, বিশৃঙ্খলা, অব্যবস্থপনা আর কালক্ষেপণ; যার পিছনে কাজ করেছে আন্তরিকতা, পরিকল্পনা এবং ধারাবাহিকতার প্রকট অভাব।

এমন প্রেক্ষাপটে পর্যটনের এই দৈন্যদশার পিছনে কি কি ঘাটতি ছিল তা যদি চিহ্নিত করতে হয় তাহলে দেখা যাবে একেবারেই মৌলিক বিষয়গুলো যা পর্যটনের বিকাশ তথা উন্নয়নের পূর্বশর্ত তা তার ভাগ্যে জুটেনি। এর মধ্যে রয়েছে –

একঃ আমাদের অমিত সম্ভাবনার পর্যটক আকর্ষণ তথা পর্যটন সম্পদগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত এবং স্তরীকরণ করা হয়নি;

দুইঃ সাধারণ অবকাঠামো এবং পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে পর্যটন সম্পদকে পর্যটন পণ্যে রূপান্তর করা হয় নি;

তিনঃ পর্যটন সেবা চিহ্নিত করে তা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণের জন্য মান সম্পন্ন পর্যটন সেবা বা কিউটিএস (QTS) পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়নি;

চারঃ পর্যটনের মত একটি আধুনিক শিল্পের বিকাশ এবং প্রসারের জন্য দেশে-বিদেশে আধুনিক ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর যে প্রচার-প্রচারণার দরকার ছিল তা কখনই করা হয়নি;

পাঁচঃ পর্যটনকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা দিলেও আজ পর্যন্ত শিল্প সহায়ক সুবিধা যেমন স্বল্প সুদে ঋণ, প্রণোদনা, কর রেয়াত, ভুমি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, বর্জ্য অপসারণ ইত্যাদি সুবিধা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রাপ্তি নিশ্চিত করা হয়নি;

ছয়ঃ সঠিক কোন পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হয়নি। উপরন্তু ১৯৮৮ সালে একবার পর্যটন মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। একইভাবে আবার ২০১৯ সালে পর্যটন মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দিয়ে মোটা অংকের অর্থ ব্যয় করার পরও আজ পর্যন্ত তা আলোর মুখ দেখেনি।

সাতঃ দীর্ঘ চুয়ান্ন বছরের মধ্যে ১৯৯২ সালে একবার এবং ২০১০ সালে আরেকবার পর্যটন নীতিমালা প্রণয়ন করেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি এবং তেমন কোন উদ্যোগও নেয়া হয়নি।

আটঃ মানব সম্পদ উন্নয়নের সাথে সম্পৃক্ত পক্ষগুলো যেমন ছাত্র, শিক্ষক, কর্তৃপক্ষ, চাকুরীদাতা এদের মধ্যেকার বিরাজিত নানা সমস্যা এবং প্রকৃত চাহিদা নিরূপন করে তা দূর করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে যে সমন্বয় দরকার সে কাজে আজ পর্যন্ত কোন কর্তৃপক্ষ বা বিভাগ কিছুই গড়ে উঠেনি।

নয়ঃ অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এই বৃহৎ শিল্পটির উন্নয়নকল্পে ব্যাপক গবেষণার কোন বিকল্প নেই। অথচ আজ অবধি এ লক্ষে কোন “পর্যটন গবেষণা প্রতিষ্ঠান” গড়ে তোলা হয়নি। উপরন্তু অবিশ্বাস্য মনে হলেও এখানকার সকল পর্যটন কর্মকাণ্ড চলছে ন্যূনতম কোন গবেষণা কাজ এবং ব্যবস্থাপনা ছাড়াই বিচ্ছিন্নভাবে।

দশঃ শুনতে অবাক লাগলেও আজ পর্যন্ত এই শিল্পটিকে চলতে হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের “ট্যুরিজম সেটেলাইট একাউন্ট” (TSA) পদ্ধতির ব্যবহার দূরে থাক ন্যুনতম নির্ভরযোগ্য কোন পরিসংখ্যান ছাড়াই স্রেফ অন্যের উপর নির্ভর করে এবং অন্ধকারে থেকে হামাগুড়ি দিয়ে।

এগারোঃ পর্যটনের মত একটি বিশাল ও বিস্তৃত শিল্পের নিজের চলার জন্য ন্যূনতম যা না থাকলেই নয় অর্থাৎ যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত সমেত নির্ভরযোগ্য যে “জাতীয় পর্যটন তথ্য ভাণ্ডার” (National Tourism Data Base) তা না থাকায় এখন পর্যন্ত সকল পর্যটন কর্মকাণ্ড পর্যটনের নিয়মে চলছেনা; চলছে স্রেফ অনুমান এবং অন্যের দেয়া মনগড়া তথ্যের উপর নির্ভর করে।

বারোঃ ন্যূনতম এবং সঠিক পরিকল্পনার অভাবে যেমনি একদিকে বাজেট বরাদ্দের সঠিক চাহিদা কখনো নিরূপন করা যাচ্ছেনা ঠিক তেমনি অন্যদিকে প্রয়োজনীয় কোন বাজেট বরাদ্দ ছাড়াই এই শিল্পটি চরম বৈষম্য ও অবহেলার মধ্য দিয়ে বছরের পর বছর ধরে শুধু রুগ্ণ হচ্ছে এবং চাতক পাখির মত দিন কাটাচ্ছে।

তেরোঃ অতি প্রয়োজনীয় “সুনির্দিষ্ট পর্যটন আইন” এর অভাবে শিল্পটির মধ্যে যেমনি শৃঙ্খলার প্রকট অভাব তেমনি পর্যটন ব্যবস্থাপনার অনুপস্থিতি গোটা পর্যটন শিল্পকে লেজেগোবরে অবস্থার মধ্যে ফেলে রেখেছে।

চৌদ্দঃ বেসরকারি খাতের সাথে যথাযথ আইনি সম্পর্ক না থাকায় শুধু মুখে বলা হলেও কার্যত কোন আনুপাতিক অংশীদারিত্ব ছাড়াই চলছে সবকিছু। এতে সরকারি খাত এবং বিশেষ করে প্রশাসনের একচ্ছত্র মুনশীয়ানা গোটা শিল্পকে পঙ্গু ও গতিহীন করে রেখেছে।

পনেরোঃ একদিকে সম্ভাবনাময় এই শিল্পটি নিজে এবং অন্যদিকে এই শিল্পের বেসরকারি খাত চরম অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার। যেজন্য এই শিল্পে যারা দীর্ঘদিন ধরে দেশে-বিদেশে সার্বিকভাবে অবদান রেখেছেন এবং বিনিয়োগ করেছেন তাদের জাতীয় পর্যায় দূরে থাক পর্যটন শিল্পের পক্ষ থেকেও আজ পর্যন্ত কোন স্বীকৃতি বা সম্মাননা দেয়া হয়নি। তাহলে অন্যরাইবা উৎসাহ পাবে কি করে; এই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

ষোলঃ সর্বশেষ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এমন সম্ভাবনার শিল্পটি তার যাত্রা শুরু করে প্রথমে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের  অধীনে এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহনের সাথে যৌথভাবে একটি মন্ত্রণালয়ে স্থান পেলেও এক অদৃশ্য কারণে আজ অবধি সম্পূর্ণ পৃথক ও শক্তিশালী মন্ত্রণায় এবং তার সাথে অভিজ্ঞ, দক্ষ ও গতিশীল নেতৃত্ব বলে তেমন কিছুই পায়নি। বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি পৃষ্টপোষকতা ও নেতৃত্ব যা না হলে পর্যটন উন্নয়ন অসম্ভব। ঠিক তেমনি পায়নি সম্পূর্ণ আমলাদের দখলে থাকা এবং মান্ধাতার আমলের ঘুণেধরা প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তে একটি আধুনিক, গতিশীল, দক্ষ, কার্যকর ও আন্তরিকতার মিশেলে গড়ে ওঠা একটি আধুনিক প্রশাসন।

এভাবে চুয়ান্ন বছর ধরে এই শিল্পটিকে বিস্তর অবহেলা, অযত্ন, বিশৃঙ্খলা এবং অব্যবস্থাপনায় রাখার পাশাপাশি ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থ চরিতার্থ করার মধ্য দিয়ে তার স্বাভাবিক বেড়ে ওঠাকে শুধু বিলম্বিতই করা হয়নি উপরন্তু অনেকটা গলা টিপে নিঃশেষের দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। এজন্য সরকারি এবং বেসরকারি উভয় খাতই দায়ী। তবে, শিল্পটির একচ্ছত্র অভিভবাক হিসেবে সরকারের দায়ই বেশি। তাহলে সংক্ষেপে দেখা যাক এই ব্যর্থতার হিস্যা কার কতটুকু।

একঃ সরকারি খাত      

সরকারি খাত তথা সরকারের আবার দুটি ভাগ – (১) রাজনৈতিক সরকার এবং (২) প্রশাসনিক সরকার। রাজনৈতিক সরকারের শীর্ষে থাকেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং সার্বিকভাবে দেখভাল করেন দায়িত্বপ্রাপ্ত মাননীয় মন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব হচ্ছে সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা ও নেতৃত্ব দেয়ার মাধ্যমে শিল্পটির উন্নয়ন সম্পৃক্ত যেকোন পরিকল্পনা কিংবা প্রস্তাব অনুমোদন দেয়ার পাশাপাশি তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন অনুসারে অন্যান্য মন্ত্রণালয় কিংবা বিভাগকে সরাসরি সহায়তার নির্দেশ দেয়া এবং সার্বিক পর্যটন ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নজরদারি করা। আবার মাননীয় মন্ত্রীর দায়িত্ব হচ্ছে সামগ্রিকভাবে মন্ত্রণালয়ের দেখভাল করা এবং বিশেষ করে এই শিল্পের উন্নয়ন নিয়ে সরকার কি ভাবে তা নীতি আকারে প্রকাশ করা। পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে প্রশাসনকে সার্বিক সহায়তা দিয়ে এবং বেসরকারি খাতকে প্রয়োজন মোতাবকে ব্যবহার করে প্রণীত  নীতিমালা বাস্তবায়নসহ সার্বিক পর্যটন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সর্বোতভাবে নিশ্চিত করা। অথচ এসব কাজে সার্বিকভাবে সরকারের ব্যর্থতা এবং বিশেষ করে মন্ত্রীদের আন্তরিকতার অভাব ছাড়াও অজ্ঞতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রশাসন তথা আমলারা পর্যটনকে পর্যটনের মত চলতে না দিয়ে তাদের নিজেদের মত পর্যটনকে চালানো এবং সরকারকে ভুল পরামর্শের মাধ্যমে অন্ধকারে রাখার ফলে এত বছর পরও পর্যটনের মৌলিক কোন কাজ হয়নি। এমন কি এক সরকার ক্ষমতায় আসার পর আগেকার সরকারের কোন একটি ভালো উদ্যোগ থাকলেও তা বাদ দিয়ে নতুন কিছু করার দিকে ঠেলে দেয়াতে পর্যটন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ন্যুনতম ধারাবাহিকতাও রক্ষা করা হয়নি। এতে সরকারগুলোকে ব্যর্থতার দায়ভার নেয়ার পাশাপাশি পর্যটনকেও ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে পড়তে হয়েছে।

আবার প্রশাসনিক সরকার তথা প্রশাসনযন্ত্র সরকারকে ভুলভাল বুঝিয়ে শুধু শুধু প্রশাসনিক কাঠামোকে বর্ধিত করার কাজ করায় আমলাদের পদ পদবী ও চাকুরীর সুযোগ বৃদ্ধি ছাড়া পর্যটনের কোন লাভতো হয়ই নি উপরন্তু সরকারকে অযথা অতিরিক্ত প্রশাসনিক ব্যয় বহন করতে হয়েছে; কাজকর্মকে অডিট আপত্তিতে পড়তে হয়েছে এবং যেকোন কাজ দীর্ঘসূত্রিতায় ফেলে ব্যর্থতায় পর্যবেশিত করা হয়েছে। এসব কাজে প্রশাসনযন্ত্র একচেটিয়াভাবে রাজনৈতিক সরকারের নেক নজরে থাকা লোকজন এবং বেসরকারিখাতের চিহ্নিত কিছু অসৎ, তেলবাজ ও মতলবাজ চক্রকে ব্যবহার করে থাকে। যারা সরকার পরিবর্তনের পরও নিজেদের অবস্থানকে নানাভাবে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়ে যায়। এভাবেই সরকারি খাত তথা সরকারগুলোকে যুগ যুগ ধরে ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে বিদায় নিতে হচ্ছে এবং সম্ভাবনার পর্যটন শিল্প ধুঁকে ধুঁকে প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত এসে পৌঁছেছে।

দুইঃ বেসরকারি খাত   

বেসরকারি খাতের ভূমিকা হওয়ার কথা উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে সরকারি খাতকে পর্যটন উন্নয়নে সার্বিক সহযোগিতা দেয়া  এবং পর্যটন শিল্প সম্পৃক্ত বিভিন্ন সমস্যা, অসঙ্গতি, দাবিদাওয়া ইত্যাদির পাশাপাশি অভিজ্ঞতালব্দ বিভিন্ন পরামর্শ সরকারের কাছে তুলে ধরা। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য বেসরকারি খাত এসবের কিছুই ঠিকমত করতে পারেনি শুধুমাত্র নিজেদের মধ্যেকার অনৈক্য, হিংসা, বিদ্বেষ আর অহমের কারণে এবং যোগ্য ও অভিজ্ঞ নেতৃত্বের অভাবে। অথচ রাজনৈতিক বিবেচনায় এবং অসৎ আমলাদের যোগসাযোগে বে-আইনিভাবে ব্যবসায়িক সংগঠন বা ট্রেড অর্গানাইজেশন (TO) লাইস্যান্স দেয়ার ফলে এক ডজনের বেশি পর্যটন সমিতির উপস্থিতি পর্যটন শিল্পের জন্য কোন মঙ্গলতো দূরে থাক উপরন্তু ব্যক্তিগত হানাহানি, অন্তঃসমিতি ও আন্তঃসমিতি কোন্দল, পরনিন্দা, পরচর্চা ইত্যাদি এখানকার সামগ্রিক পরিবেশ-পরিস্থিতিকে অনেকটা অসুস্থ ও অসহনীয় করে তুলেছে।

এভাবে অর্ধশত বছরের অধিক সময় অতিবাহিত করা একটি সম্ভাবনাময় শিল্পের ভাগ্যে প্রত্যাশিত উন্নয়ন না জুটলেও জুটেছে সমস্যার পাহাড়। তার মধ্য থেকে মৌলিক এবং মোটা দাগের কিছু সমস্যা এখানে উল্লেখ করা হয়েছে যা উল্লেখ না করলে নয় এবং এগুলো জরুরী ভিত্তিতে সমাধানে নতুন সরকার যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করবেন এটাই জাতির প্রত্যাশা। অবশ্য এজন্য যে খুব বেশি সময় লাগবে কিংবা একসাথে বড় ধরণের কোন ব্যয় নির্বাহ করতে হবে তাও নয়। যা লাগবে তা হচ্ছে আন্তরিকতা, সদিচ্ছা, দৃঢ়তা, কর্মনিষ্ঠা এবং তার সাথে ধারাবাহিকতা। আমরা বিশ্বাস করি নতুন সরকারের মধ্যে এসবের কোন ঘাটতি নেই। ইনশাআল্লাহ, সরকার তা করে দেখাতে সক্ষম হবে। আর এজন্য সরকারকে যা যা করতে হবে তা হলো –

একঃ অনতিবিলম্বে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তথা সরকার প্রধানকে পর্যটন শিল্পের সরাসরি নেতৃত্ব ও পৃষ্ঠপোষকতার দায়িত্ব নিতে হবে। কেন না এছাড়া এই শিল্পে যেমনি শৃঙ্খলা ফিরে আসবেনা তেমনি সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়ন কখনো সম্ভব হবেনা।

দুইঃ পর্যটনের নামে সম্পূর্ণ পৃথক ও শক্তিশালী মন্ত্রণালয় গঠন করে পর্যটন বিষয়ে ন্যুনতম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন, সৎ ও নিষ্ঠাবান তথা কর্মট একজন মন্ত্রী মহোদয়কে দায়িত্ব দিতে হবে। নাহয় আমলাতান্ত্রিক চাণক্য যে প্রশাসন তাকে নেতৃত্ব দেয়া এবং পর্যটনকে পর্যটনের মত চালানোর যেকোন প্রচেষ্টা আবারো ব্যর্থতায় পর্যবেশিত হবে।

তিনঃ বর্তমান দ্বি স্তর বিশিষ্ট এবং শ্বেতহস্তী ধাঁচের প্রশাসন (White Elephant Administration) কাঠামোকে বাস্তবতার নিরিখে ত্রিস্তর বিশিষ্ট যথা (১) “প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়”; (২) “পর্যটন কর্তৃপক্ষ” যা বিদ্যমান দুই প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ “বাংলাদেশ পর্যটক করপোরেশন” ও “বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড”-কে একীভূত করে করতে হবে এবং (৩) “ডেসটিনেশন ম্যানেজমেন্ট অফিস” (ডিএমও) যা মাঠ বা আঞ্চলিক পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত করে পর্যটনকে ডায়নামিক বা গতিশীল তথা উদ্যমী, চৌকস, কর্মট ও কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে দাঁড় করাতে হবে। অবশ্য ডিএমও করতে হবে পণ্যের উপস্থিতির উপর ভিত্তি করে। প্রসঙ্গতঃ এক সময় গোটা দেশে দশটি ডিএমও করার সিদ্ধান্ত নিয়েও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি শুধু আমলাদের কারসাজিতে। অবশ্য এই ডিএমও দ্বারা বর্তমানে মাঠ পর্যায়ে জেলা প্রশাসকদের উপর ন্যস্ত দায়িত্ব ফিরিয়ে নিয়ে আসা সম্ভব  হবে। তা নাহলে এত বিশাল ও বিস্তৃত এই শিল্পটিকে প্রশাসনিকভাবে দেশব্যাপী সঠিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, ব্যবস্থাপনা এবং প্রচার প্রচারণার আওতায় আনা সম্ভব  হবেনা এবং সমস্যা থেকেই যাবে।

চারঃ সুনির্দিষ্ট পর্যটন আইনের ঘাটতি পূরণ, প্রশাসনিক কাঠামো আধুনিকীকরণ এবং পর্যটন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার লক্ষে ২০০৭ সালে সরকারি এবং বেসরকারি খাতের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বহুল প্রতীক্ষিত “একক পর্যটন আইন” প্রণয়নের জন্য যে খসড়াটি তৈরী করেও শেষ মুহুর্তে শুধুমাত্র আমলাতন্ত্রের তেলেসমাতিতে আইনে পরিণত করা সম্ভব হয়নি তা এবার দেরী না করে সম্পন্ন করতে হবে; নাহয় সত্যিকার পর্যটন উন্নয়ন প্রচেষ্টা বরাবরের মত অধরাই থেকে যাবে।

পাঁচঃ দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে সবচেয়ে ক্ষিপ্র গতির শিল্প পর্যটনের জন্য বিশ-পচিশ বছর সামনে রেখে মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব। তাছাড়া মহাপরিকল্পনা নিয়ে আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা শুধুই হতাশার। তাই বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত এবং বিশেষ করে আমাদের পাশের দেশ শ্রীলঙ্কার ন্যায় তিন-চার বছরের জন্য “কৌশলগত পর্যটন পরিকল্পনা” বা ট্র্যাটেজিক ট্যুরিজম প্ল্যান (Strategic Tourism Planing) প্রণয়ন করে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং সময় ও অর্থ অপচয়ের যে মন্দ রীতি গড়ে উঠেছে তা নস্যাত করে দিতে হবে।

ছয়ঃ আর সময় নষ্ট না করে দ্রুত নির্ভূল মাঠ জরিপের মাধ্যমে পর্যটন সম্পদ ও সেবা সমূহ চিহ্নিত এবং স্তরীকরণ করে যথাযথ সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ দ্বারা পর্যটন পণ্যে রূপান্তর নিশ্চিত করার লক্ষে প্রয়োজনীয় সাধারণ অবকাঠামো এবং পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নের কাজকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি মানসম্পন্ন পর্যটন সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে “কোয়ালিটি ট্যুরিজম সার্ভিস” (QTS) পদ্ধতি চালু করতে হবে। এজন্য প্রয়োজনে স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা কাজে লাগাতে হবে যাতে সময় ক্ষেপণ (Time-wasting) এবং দায়িত্ব পালনে কালক্ষেপণ (Procrastination) নাহয়।

সাতঃ রূপান্তরিত পর্যটন পণ্যগুলোকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পণ্য সংকেতীকরণ বা প্রডাক্ট ব্র্যান্ডিং (Product Banding) দ্বারা আকর্ষণীয় ও যাথাযত নামকরণ সম্পন্ন শেষে অগ্রাধিকার নিরূপণের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট বাজার তথা টার্গেট মার্কেট (Target Market) চুড়ান্ত করতে হবে। তারপর সময় ক্ষেপণ না করে আধুনিক ও তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর বাজার ব্যবস্থাপনা কাজে লাগিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক ও কার্যকর প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে।

আটঃ তুলনামূলকভাবে আমাদের দেশে পর্যটন পণ্যের দাম বেশি এবং এজন্য পর্যটন সেবাগুলোর নিয়ন্ত্রণহীন চড়া দামই দায়ী। তাই এই সমস্যা দূর করার জন্য “কোয়ালিটি ট্যুরিজম সার্ভিস” (QTS) পদ্ধতি চালুর মাধ্যমে বিশেষ করে পর্যটন এলাকাগুলোতে সংকেতীকরণ ষ্টিকার ও তালিকাভূক্তি নিশ্চিত করে পর্যটকদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে মান সম্পন্ন সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। এতে অন্তত বিদেশি পর্যটকদের এবং বিশেষ করে বাজেট এবং ব্যাকপ্যাকার (Budget and Backpacker) পর্যটকদের সবচেয়ে বড় সমস্যাটি দূর হবে। তার সাথে বিদেশি এবং বিশেষ করে পর্যটন পণ্যের বাজার হিসেবে টার্গেট বা নিশানায় থাকা দেশগুলোর পর্যটকদের জন্য “ভিসা অন এরাইভাল এবং “ইলেক্ট্রনিক ভিসা” (Visa on Arrival – VoA & Electronic Visa – E-visa) প্রাপ্তি সহজ এবং নিশ্চিত করতে হবে।

নয়ঃ যে দেশে সঠিক পরিসংখ্যান এবং নির্ভরযোগ্য (Reliable) তথ্য-উপাত্ত নাই সে দেশে পর্যটন নাই। অথচ আমরা চলছি এগুলো ছাড়াই। তাই অনতিবিলম্বে জাতীয় পর্যটন তথ্য ভাণ্ডার বা “ন্যাশনাল ট্যুরিজম ডাটা বেস” (NTDA) এবং সঠিক ও আন্তর্জাতিক মানের পরিসংখ্যান নিশ্চিত করার লক্ষে “ট্যুরিজম স্যাটেলাইট একাউন্ট” (TSA) পদ্ধতি চালুর ব্যবস্থা করতে হবে। তার সাথে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যাবতীয় পর্যটন শিল্প সহায়ক সুবিধা এবং ওয়ান ষ্টপ সার্ভিস (OSS) সুবিধাসহ সাকূল্যে বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে হবে।

দশঃ এই শিল্পে মানব সম্পদ উন্নয়নের লক্ষে অনতিবিলম্বে “পর্যটন শিক্ষণ ও প্রশিক্ষণ উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ” (TETDRA) নামে একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করতে হবে। এটির কাজ হবে মূলত আধুনিক, দক্ষ এবং মান সম্পন্ন শিক্ষণ ও প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার লক্ষে সর্বোস্তরে পাঠ্যসূচী অনুমোদন, মান নিয়ন্ত্রণ, জাতীয় সনদপত্র প্রদান, কর্মসংস্থান, গবেষণা এবং তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ ইত্যাদি কর্ম সম্পাদন করা।

এগারোঃ প্রশাসন তথা আমলাতন্ত্রকে শৃঙ্খলিত করা না গেলে এবং বেসরকারি খাতের ভুঁইফোঁড় নেতৃত্বকে সামাল দেয়া না হলে অন্তত পর্যটন শিল্পে কোন উদ্যোগই সফলতার মূখ দেখবেনা। তাই সরকার প্রধানের নেতৃত্বে সরকারি বেসরকারি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে স্বল্প পরিসরের সর্বোচ্চ একটি “জাতীয় পর্যটন নীতি নির্ধারণী পর্ষদ” (NTPC) থাকতে হবে এবং পর্যটনের যেকোন বিষয়ে এই পর্ষদের সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত বলে গণ্য হবে। এর সদস্য শুধু তারাই হবেন যাদের বিস্তারিত  আমলনামা বা জীবন বৃত্তান্ত বিবেচনায় এই শিল্পে স্বীকৃত অবদান, দেশে-বিদেশে কর্মযজ্ঞ, গ্রহণযোগ্যতা, বয়স ও ব্যক্তিত্ব ইত্যাদি বিবেচনায় সবার উপরে স্থান পাবেন এবং এদের নিয়ে কোন রাজনৈতিক কিংবা ব্যক্তিক বিতর্ক থাকবেনা। মোদ্দাকথা, এখন থেকে বিশেষজ্ঞ তথা গুণীজন নির্বাচনের জন্য “বয়ান নয় প্রমাণ” হবে যোগ্যতার মাপকাটি।

বারোঃ বেসরকারিখাতকে শুধু মৌখিকভাবে উন্নয়ন সহযোগী না বলে বাস্তবে এবং সর্বোস্তরে এই খাতের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে যাতে কোথাও যেন রাজনৈতিক কিংবা ব্যক্তিক বিবেচনায় ভুঁইফোঁড় ও অযোগ্যরা আর জায়গা না পায়। বিশেষ করে নীতি নির্ধারণী কাজ এবং পরামর্শকের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিযুক্তি তথা দায়িত্ব প্রদানের জন্য বেসরকারি খাতের মধ্যে যারা দীর্ঘদিন ধরে দেশে-বিদেশে সার্বিকভাবে পর্যটন শিল্পে অবদান রেখেছেন তাদের বিস্তারিত জীবনবৃত্তান্ত, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, গ্রহণযোগ্যতা, বয়স ও ব্যক্তিত্ব ইত্যাদি যাচাই বাছাই করে এবং যেকোন বিতর্কের উর্দ্ধে থেকে অন্তত সর্বোচ্চ পর্যায়ে যে কয়েকজনকে পাওয়া যাবে তাদের চিহ্নিত এবং জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি তথা সম্মানিত করার মাধ্যমে ন্যাশনাল “ট্যুরিজম এলিট প্যানেল” (TEP) এর অন্তর্ভূক্ত করে রাখতে হবে। এতে তাদের সাথে সাথে পর্যটন শিল্প এবং জাতি উভয়েই সম্মানিত হবে; পাশাপাশি পর্যটনের যেকোন প্রয়োজনে এবং তাৎক্ষণিকভাবে তাদের অভিজ্ঞতা ও  দক্ষতা কাজে লাগানো যাবে।

সর্বসাকুল্যে অন্তত এই কাজগুলো করা গেলে পর্যটন এযাত্রায় যেমনি বিলিন হওয়া থেকে রক্ষা পাবে তেমনি নেতৃত্বগুণে উন্নয়নের ধারায় ফিরে আসবে। এজন্য সদাশয় সরকারকে আন্তরিকতার সাথে অনেকটা কঠিন হয়ে নেতৃত্বের হাল ধরতে  হবে। তবে সরকারি কিংবা বেসরকারি পর্যায়ের কোন অযোগ্য, অপদার্থ, মতলববাজ তথা ভুঁইফোঁড়কে আর যেন কোন অবস্থাতেই কোন স্তরে প্রবেশাধিকার দেয়া কিংবা রাজনৈতিক ও ব্যক্তিক আছরকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া না হয়। বিশেষ করে  আমলাতন্ত্র কর্তৃক আধিপত্য বিস্তার ও নোক্তা দেয়ার মাধ্যমে ফায়দা লুটা এবং জটিলতা সৃষ্টি করাকে যেকোনভাবে রহিত করতে হবে। তা নাহলে শেষতক আবারো সব উদ্যোগ আয়োজন জলে যাবে।

পরিশেষে, সার্বিক সাফল্য কামনা করে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে চাই, ইনশাল্লাহ “পরিকল্পনা” সামনে নিয়ে যাত্রা শুরু করা নতুন এই সরকার দেশ ও জাতির স্বার্থে জরুরীভাবে এসব কল্যাণকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে সম্ভাবনাময় পর্যটনকে তার উন্নয়নের ধারায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে। আর তখনই গোটা বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশও পর্যটন থেকে নানাভাবে উপকৃত হবে; সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) বৃদ্ধি পাবে এবং বিদেশে দেশের সুনাম বাড়বে।

 

লেখকঃ চেয়ারম্যান, সেন্টার ফর ট্যুরিজম স্টাডিজ (সিটিএস)

 

ট্যাগস :

নতুন সরকার এবং পর্যটনের প্রত্যাশা

নতুন সরকার এবং পর্যটনের প্রত্যাশা

আপডেট সময় ০১:২৮:০৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬

জামিউল আহমেদ :: অভিনন্দন! নতুন নির্বাচিত সরকারকে। পর্যটনের পক্ষ থেকে নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানানো অনেকটা রেওয়াজ হলেও এবার তাতে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। আর তা হচ্ছে প্রত্যাশার আকাশচুম্বীতা; যার সাথে পর্যটনের অস্তিত্বের প্রশ্ন জড়িত। কেন না ব্যাপক সম্ভাবনা নিয়ে যাত্রা শুরু করা পর্যটনকে আজ চুয়ান্ন বছরে এসে প্রত্যাশা পূরণ দূরে থাক উপরন্তু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে এই শিল্পটি আদৌ থাকবে কি থাকবেনা। এমন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সদাশয় সরকারকে আগেকার সরকারগুলোর মত কোন ভনিতা না করে সুচিন্তিত ও সঠিক সিদ্ধান্তে আসতে হবে যা দ্বারা হয় পর্যটন তার অপার সম্ভাবনা নিয়ে ব্যাপকভাবে ঘুরে দাঁড়াবে নাহয় ধীর ধীরে হারিয়ে যাবে আমাদের অভিশাপ দিয়ে।

তবে আশার কথা, নতুন সরকারকে অনেক ব্যাপারেই ইতিবাচক এবং বাস্তববাদী মনে হচ্ছে। এজন্য সরকারকে ভেবে দেখতে হবে এক কৃষি ছাড়া আমাদের বিকল্প ও নিজস্বতা আছে তেমন কিছু নেই। এক্ষেত্রে কৃষির পরেই স্থান দেয়া যায় এই পর্যটনকে যা হারিয়ে যাবার ভয়তো নেই উপরন্তু বিকশিত হবে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে।

কেন না অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থান, দারিদ্র দূরীকরণ, সংস্কৃতি সংরক্ষণ, পরিবেশ রক্ষা, টেকসই উন্নয়ন এগুলো হচ্ছে পর্যটনের প্রধান সাফল্য যা বিশ্বসেরা। আবার যে কৃষক, নারী এবং তরুণদেরকে সামনে রেখে এই সরকার তার পরিকল্পনার ছক করে এগুচ্ছে তাদের জন্য এই পর্যটন হতে পারে সত্যিই মোক্ষম। কেন না গোটা বিশ্বে মোট যে কর্মসংস্থান তার প্রতি দশজনের একজন এবং দ্রুত কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রতি চারজনের একজন হচ্ছে এই পর্যটন শিল্পের মানুষ। আবার পর্যটন শিল্পে নারী এবং তরুণদের হিস্যা হচ্ছে যথাক্রমে শতকরা ৬০-৬৫ এবং ১৫-২৫ ভাগ। আবার কৃষির সাথে পর্যটনের সরাসরি সম্পর্ক থাকায় প্রান্তিক কৃষকের জন্যও রয়েছে বিস্তর সুযোগ। এছাড়াও আমাদের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে পর্যটন সম্পদ এবং মানব সম্পদের পর্যাপ্ততা। যেজন্য প্রশ্ন হলো অতীত সরকারগুলো ব্যর্থ বলে এই সরকার কেন এই অপার ও অফুরন্ত সম্ভাবনাকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজে লাগাবেনা? এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর রয়েছে সরকারেরই কাছে যা মোকাবেলা করতে হবে বাস্তবতার নিরিখে এবং আল্লাহর দেয়া নেয়ামত তথা প্রকৃতির অপার দানকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগিয়ে।

অবশ্য এজন্য সরকারকে প্রথমেই সত্যানুসন্ধান করে দেখতে হবে আমাদের অতি সম্ভাবনাময় পর্যটনের এই দৈন্যদশার জন্য কারা দায়ী এবং কি জন্য এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। তবে তা হতে হবে বাস্তবতার নিরিখে সুচিন্তিত এবং সুবিবেচনাপ্রসূত। কেন না বাস্তব সত্য হচ্ছে পর্যাপ্ত পর্যটন সম্পদ এবং মানব সম্পদ থাকার পরও এমন অমিত সম্ভাবনার পর্যটন শিল্পটি তার প্রত্যাশিত উন্নয়নের ধারা থেকে ছিটকে পড়ার কারণ চিহ্নিত করা গেলে সরকারের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ হবে। এজন্য প্রথমেই দেখতে হবে এই দীর্ঘ সময়ে সম্ভাবনাময় পর্যটনের জন্য ন্যুনতম কি কি প্রয়োজন ছিল যা সে পায়নি। উপরন্তু পেয়েছে বাগাড়ম্বর, অবহেলা, অসততা, বিশৃঙ্খলা, অব্যবস্থপনা আর কালক্ষেপণ; যার পিছনে কাজ করেছে আন্তরিকতা, পরিকল্পনা এবং ধারাবাহিকতার প্রকট অভাব।

এমন প্রেক্ষাপটে পর্যটনের এই দৈন্যদশার পিছনে কি কি ঘাটতি ছিল তা যদি চিহ্নিত করতে হয় তাহলে দেখা যাবে একেবারেই মৌলিক বিষয়গুলো যা পর্যটনের বিকাশ তথা উন্নয়নের পূর্বশর্ত তা তার ভাগ্যে জুটেনি। এর মধ্যে রয়েছে –

একঃ আমাদের অমিত সম্ভাবনার পর্যটক আকর্ষণ তথা পর্যটন সম্পদগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত এবং স্তরীকরণ করা হয়নি;

দুইঃ সাধারণ অবকাঠামো এবং পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে পর্যটন সম্পদকে পর্যটন পণ্যে রূপান্তর করা হয় নি;

তিনঃ পর্যটন সেবা চিহ্নিত করে তা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণের জন্য মান সম্পন্ন পর্যটন সেবা বা কিউটিএস (QTS) পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়নি;

চারঃ পর্যটনের মত একটি আধুনিক শিল্পের বিকাশ এবং প্রসারের জন্য দেশে-বিদেশে আধুনিক ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর যে প্রচার-প্রচারণার দরকার ছিল তা কখনই করা হয়নি;

পাঁচঃ পর্যটনকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা দিলেও আজ পর্যন্ত শিল্প সহায়ক সুবিধা যেমন স্বল্প সুদে ঋণ, প্রণোদনা, কর রেয়াত, ভুমি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, বর্জ্য অপসারণ ইত্যাদি সুবিধা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রাপ্তি নিশ্চিত করা হয়নি;

ছয়ঃ সঠিক কোন পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হয়নি। উপরন্তু ১৯৮৮ সালে একবার পর্যটন মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। একইভাবে আবার ২০১৯ সালে পর্যটন মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দিয়ে মোটা অংকের অর্থ ব্যয় করার পরও আজ পর্যন্ত তা আলোর মুখ দেখেনি।

সাতঃ দীর্ঘ চুয়ান্ন বছরের মধ্যে ১৯৯২ সালে একবার এবং ২০১০ সালে আরেকবার পর্যটন নীতিমালা প্রণয়ন করেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি এবং তেমন কোন উদ্যোগও নেয়া হয়নি।

আটঃ মানব সম্পদ উন্নয়নের সাথে সম্পৃক্ত পক্ষগুলো যেমন ছাত্র, শিক্ষক, কর্তৃপক্ষ, চাকুরীদাতা এদের মধ্যেকার বিরাজিত নানা সমস্যা এবং প্রকৃত চাহিদা নিরূপন করে তা দূর করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে যে সমন্বয় দরকার সে কাজে আজ পর্যন্ত কোন কর্তৃপক্ষ বা বিভাগ কিছুই গড়ে উঠেনি।

নয়ঃ অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এই বৃহৎ শিল্পটির উন্নয়নকল্পে ব্যাপক গবেষণার কোন বিকল্প নেই। অথচ আজ অবধি এ লক্ষে কোন “পর্যটন গবেষণা প্রতিষ্ঠান” গড়ে তোলা হয়নি। উপরন্তু অবিশ্বাস্য মনে হলেও এখানকার সকল পর্যটন কর্মকাণ্ড চলছে ন্যূনতম কোন গবেষণা কাজ এবং ব্যবস্থাপনা ছাড়াই বিচ্ছিন্নভাবে।

দশঃ শুনতে অবাক লাগলেও আজ পর্যন্ত এই শিল্পটিকে চলতে হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের “ট্যুরিজম সেটেলাইট একাউন্ট” (TSA) পদ্ধতির ব্যবহার দূরে থাক ন্যুনতম নির্ভরযোগ্য কোন পরিসংখ্যান ছাড়াই স্রেফ অন্যের উপর নির্ভর করে এবং অন্ধকারে থেকে হামাগুড়ি দিয়ে।

এগারোঃ পর্যটনের মত একটি বিশাল ও বিস্তৃত শিল্পের নিজের চলার জন্য ন্যূনতম যা না থাকলেই নয় অর্থাৎ যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত সমেত নির্ভরযোগ্য যে “জাতীয় পর্যটন তথ্য ভাণ্ডার” (National Tourism Data Base) তা না থাকায় এখন পর্যন্ত সকল পর্যটন কর্মকাণ্ড পর্যটনের নিয়মে চলছেনা; চলছে স্রেফ অনুমান এবং অন্যের দেয়া মনগড়া তথ্যের উপর নির্ভর করে।

বারোঃ ন্যূনতম এবং সঠিক পরিকল্পনার অভাবে যেমনি একদিকে বাজেট বরাদ্দের সঠিক চাহিদা কখনো নিরূপন করা যাচ্ছেনা ঠিক তেমনি অন্যদিকে প্রয়োজনীয় কোন বাজেট বরাদ্দ ছাড়াই এই শিল্পটি চরম বৈষম্য ও অবহেলার মধ্য দিয়ে বছরের পর বছর ধরে শুধু রুগ্ণ হচ্ছে এবং চাতক পাখির মত দিন কাটাচ্ছে।

তেরোঃ অতি প্রয়োজনীয় “সুনির্দিষ্ট পর্যটন আইন” এর অভাবে শিল্পটির মধ্যে যেমনি শৃঙ্খলার প্রকট অভাব তেমনি পর্যটন ব্যবস্থাপনার অনুপস্থিতি গোটা পর্যটন শিল্পকে লেজেগোবরে অবস্থার মধ্যে ফেলে রেখেছে।

চৌদ্দঃ বেসরকারি খাতের সাথে যথাযথ আইনি সম্পর্ক না থাকায় শুধু মুখে বলা হলেও কার্যত কোন আনুপাতিক অংশীদারিত্ব ছাড়াই চলছে সবকিছু। এতে সরকারি খাত এবং বিশেষ করে প্রশাসনের একচ্ছত্র মুনশীয়ানা গোটা শিল্পকে পঙ্গু ও গতিহীন করে রেখেছে।

পনেরোঃ একদিকে সম্ভাবনাময় এই শিল্পটি নিজে এবং অন্যদিকে এই শিল্পের বেসরকারি খাত চরম অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার। যেজন্য এই শিল্পে যারা দীর্ঘদিন ধরে দেশে-বিদেশে সার্বিকভাবে অবদান রেখেছেন এবং বিনিয়োগ করেছেন তাদের জাতীয় পর্যায় দূরে থাক পর্যটন শিল্পের পক্ষ থেকেও আজ পর্যন্ত কোন স্বীকৃতি বা সম্মাননা দেয়া হয়নি। তাহলে অন্যরাইবা উৎসাহ পাবে কি করে; এই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

ষোলঃ সর্বশেষ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এমন সম্ভাবনার শিল্পটি তার যাত্রা শুরু করে প্রথমে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের  অধীনে এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহনের সাথে যৌথভাবে একটি মন্ত্রণালয়ে স্থান পেলেও এক অদৃশ্য কারণে আজ অবধি সম্পূর্ণ পৃথক ও শক্তিশালী মন্ত্রণায় এবং তার সাথে অভিজ্ঞ, দক্ষ ও গতিশীল নেতৃত্ব বলে তেমন কিছুই পায়নি। বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি পৃষ্টপোষকতা ও নেতৃত্ব যা না হলে পর্যটন উন্নয়ন অসম্ভব। ঠিক তেমনি পায়নি সম্পূর্ণ আমলাদের দখলে থাকা এবং মান্ধাতার আমলের ঘুণেধরা প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তে একটি আধুনিক, গতিশীল, দক্ষ, কার্যকর ও আন্তরিকতার মিশেলে গড়ে ওঠা একটি আধুনিক প্রশাসন।

এভাবে চুয়ান্ন বছর ধরে এই শিল্পটিকে বিস্তর অবহেলা, অযত্ন, বিশৃঙ্খলা এবং অব্যবস্থাপনায় রাখার পাশাপাশি ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থ চরিতার্থ করার মধ্য দিয়ে তার স্বাভাবিক বেড়ে ওঠাকে শুধু বিলম্বিতই করা হয়নি উপরন্তু অনেকটা গলা টিপে নিঃশেষের দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। এজন্য সরকারি এবং বেসরকারি উভয় খাতই দায়ী। তবে, শিল্পটির একচ্ছত্র অভিভবাক হিসেবে সরকারের দায়ই বেশি। তাহলে সংক্ষেপে দেখা যাক এই ব্যর্থতার হিস্যা কার কতটুকু।

একঃ সরকারি খাত      

সরকারি খাত তথা সরকারের আবার দুটি ভাগ – (১) রাজনৈতিক সরকার এবং (২) প্রশাসনিক সরকার। রাজনৈতিক সরকারের শীর্ষে থাকেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং সার্বিকভাবে দেখভাল করেন দায়িত্বপ্রাপ্ত মাননীয় মন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব হচ্ছে সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা ও নেতৃত্ব দেয়ার মাধ্যমে শিল্পটির উন্নয়ন সম্পৃক্ত যেকোন পরিকল্পনা কিংবা প্রস্তাব অনুমোদন দেয়ার পাশাপাশি তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন অনুসারে অন্যান্য মন্ত্রণালয় কিংবা বিভাগকে সরাসরি সহায়তার নির্দেশ দেয়া এবং সার্বিক পর্যটন ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নজরদারি করা। আবার মাননীয় মন্ত্রীর দায়িত্ব হচ্ছে সামগ্রিকভাবে মন্ত্রণালয়ের দেখভাল করা এবং বিশেষ করে এই শিল্পের উন্নয়ন নিয়ে সরকার কি ভাবে তা নীতি আকারে প্রকাশ করা। পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে প্রশাসনকে সার্বিক সহায়তা দিয়ে এবং বেসরকারি খাতকে প্রয়োজন মোতাবকে ব্যবহার করে প্রণীত  নীতিমালা বাস্তবায়নসহ সার্বিক পর্যটন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সর্বোতভাবে নিশ্চিত করা। অথচ এসব কাজে সার্বিকভাবে সরকারের ব্যর্থতা এবং বিশেষ করে মন্ত্রীদের আন্তরিকতার অভাব ছাড়াও অজ্ঞতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রশাসন তথা আমলারা পর্যটনকে পর্যটনের মত চলতে না দিয়ে তাদের নিজেদের মত পর্যটনকে চালানো এবং সরকারকে ভুল পরামর্শের মাধ্যমে অন্ধকারে রাখার ফলে এত বছর পরও পর্যটনের মৌলিক কোন কাজ হয়নি। এমন কি এক সরকার ক্ষমতায় আসার পর আগেকার সরকারের কোন একটি ভালো উদ্যোগ থাকলেও তা বাদ দিয়ে নতুন কিছু করার দিকে ঠেলে দেয়াতে পর্যটন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ন্যুনতম ধারাবাহিকতাও রক্ষা করা হয়নি। এতে সরকারগুলোকে ব্যর্থতার দায়ভার নেয়ার পাশাপাশি পর্যটনকেও ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে পড়তে হয়েছে।

আবার প্রশাসনিক সরকার তথা প্রশাসনযন্ত্র সরকারকে ভুলভাল বুঝিয়ে শুধু শুধু প্রশাসনিক কাঠামোকে বর্ধিত করার কাজ করায় আমলাদের পদ পদবী ও চাকুরীর সুযোগ বৃদ্ধি ছাড়া পর্যটনের কোন লাভতো হয়ই নি উপরন্তু সরকারকে অযথা অতিরিক্ত প্রশাসনিক ব্যয় বহন করতে হয়েছে; কাজকর্মকে অডিট আপত্তিতে পড়তে হয়েছে এবং যেকোন কাজ দীর্ঘসূত্রিতায় ফেলে ব্যর্থতায় পর্যবেশিত করা হয়েছে। এসব কাজে প্রশাসনযন্ত্র একচেটিয়াভাবে রাজনৈতিক সরকারের নেক নজরে থাকা লোকজন এবং বেসরকারিখাতের চিহ্নিত কিছু অসৎ, তেলবাজ ও মতলবাজ চক্রকে ব্যবহার করে থাকে। যারা সরকার পরিবর্তনের পরও নিজেদের অবস্থানকে নানাভাবে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়ে যায়। এভাবেই সরকারি খাত তথা সরকারগুলোকে যুগ যুগ ধরে ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে বিদায় নিতে হচ্ছে এবং সম্ভাবনার পর্যটন শিল্প ধুঁকে ধুঁকে প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত এসে পৌঁছেছে।

দুইঃ বেসরকারি খাত   

বেসরকারি খাতের ভূমিকা হওয়ার কথা উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে সরকারি খাতকে পর্যটন উন্নয়নে সার্বিক সহযোগিতা দেয়া  এবং পর্যটন শিল্প সম্পৃক্ত বিভিন্ন সমস্যা, অসঙ্গতি, দাবিদাওয়া ইত্যাদির পাশাপাশি অভিজ্ঞতালব্দ বিভিন্ন পরামর্শ সরকারের কাছে তুলে ধরা। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য বেসরকারি খাত এসবের কিছুই ঠিকমত করতে পারেনি শুধুমাত্র নিজেদের মধ্যেকার অনৈক্য, হিংসা, বিদ্বেষ আর অহমের কারণে এবং যোগ্য ও অভিজ্ঞ নেতৃত্বের অভাবে। অথচ রাজনৈতিক বিবেচনায় এবং অসৎ আমলাদের যোগসাযোগে বে-আইনিভাবে ব্যবসায়িক সংগঠন বা ট্রেড অর্গানাইজেশন (TO) লাইস্যান্স দেয়ার ফলে এক ডজনের বেশি পর্যটন সমিতির উপস্থিতি পর্যটন শিল্পের জন্য কোন মঙ্গলতো দূরে থাক উপরন্তু ব্যক্তিগত হানাহানি, অন্তঃসমিতি ও আন্তঃসমিতি কোন্দল, পরনিন্দা, পরচর্চা ইত্যাদি এখানকার সামগ্রিক পরিবেশ-পরিস্থিতিকে অনেকটা অসুস্থ ও অসহনীয় করে তুলেছে।

এভাবে অর্ধশত বছরের অধিক সময় অতিবাহিত করা একটি সম্ভাবনাময় শিল্পের ভাগ্যে প্রত্যাশিত উন্নয়ন না জুটলেও জুটেছে সমস্যার পাহাড়। তার মধ্য থেকে মৌলিক এবং মোটা দাগের কিছু সমস্যা এখানে উল্লেখ করা হয়েছে যা উল্লেখ না করলে নয় এবং এগুলো জরুরী ভিত্তিতে সমাধানে নতুন সরকার যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করবেন এটাই জাতির প্রত্যাশা। অবশ্য এজন্য যে খুব বেশি সময় লাগবে কিংবা একসাথে বড় ধরণের কোন ব্যয় নির্বাহ করতে হবে তাও নয়। যা লাগবে তা হচ্ছে আন্তরিকতা, সদিচ্ছা, দৃঢ়তা, কর্মনিষ্ঠা এবং তার সাথে ধারাবাহিকতা। আমরা বিশ্বাস করি নতুন সরকারের মধ্যে এসবের কোন ঘাটতি নেই। ইনশাআল্লাহ, সরকার তা করে দেখাতে সক্ষম হবে। আর এজন্য সরকারকে যা যা করতে হবে তা হলো –

একঃ অনতিবিলম্বে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তথা সরকার প্রধানকে পর্যটন শিল্পের সরাসরি নেতৃত্ব ও পৃষ্ঠপোষকতার দায়িত্ব নিতে হবে। কেন না এছাড়া এই শিল্পে যেমনি শৃঙ্খলা ফিরে আসবেনা তেমনি সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়ন কখনো সম্ভব হবেনা।

দুইঃ পর্যটনের নামে সম্পূর্ণ পৃথক ও শক্তিশালী মন্ত্রণালয় গঠন করে পর্যটন বিষয়ে ন্যুনতম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন, সৎ ও নিষ্ঠাবান তথা কর্মট একজন মন্ত্রী মহোদয়কে দায়িত্ব দিতে হবে। নাহয় আমলাতান্ত্রিক চাণক্য যে প্রশাসন তাকে নেতৃত্ব দেয়া এবং পর্যটনকে পর্যটনের মত চালানোর যেকোন প্রচেষ্টা আবারো ব্যর্থতায় পর্যবেশিত হবে।

তিনঃ বর্তমান দ্বি স্তর বিশিষ্ট এবং শ্বেতহস্তী ধাঁচের প্রশাসন (White Elephant Administration) কাঠামোকে বাস্তবতার নিরিখে ত্রিস্তর বিশিষ্ট যথা (১) “প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়”; (২) “পর্যটন কর্তৃপক্ষ” যা বিদ্যমান দুই প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ “বাংলাদেশ পর্যটক করপোরেশন” ও “বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড”-কে একীভূত করে করতে হবে এবং (৩) “ডেসটিনেশন ম্যানেজমেন্ট অফিস” (ডিএমও) যা মাঠ বা আঞ্চলিক পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত করে পর্যটনকে ডায়নামিক বা গতিশীল তথা উদ্যমী, চৌকস, কর্মট ও কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে দাঁড় করাতে হবে। অবশ্য ডিএমও করতে হবে পণ্যের উপস্থিতির উপর ভিত্তি করে। প্রসঙ্গতঃ এক সময় গোটা দেশে দশটি ডিএমও করার সিদ্ধান্ত নিয়েও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি শুধু আমলাদের কারসাজিতে। অবশ্য এই ডিএমও দ্বারা বর্তমানে মাঠ পর্যায়ে জেলা প্রশাসকদের উপর ন্যস্ত দায়িত্ব ফিরিয়ে নিয়ে আসা সম্ভব  হবে। তা নাহলে এত বিশাল ও বিস্তৃত এই শিল্পটিকে প্রশাসনিকভাবে দেশব্যাপী সঠিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, ব্যবস্থাপনা এবং প্রচার প্রচারণার আওতায় আনা সম্ভব  হবেনা এবং সমস্যা থেকেই যাবে।

চারঃ সুনির্দিষ্ট পর্যটন আইনের ঘাটতি পূরণ, প্রশাসনিক কাঠামো আধুনিকীকরণ এবং পর্যটন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার লক্ষে ২০০৭ সালে সরকারি এবং বেসরকারি খাতের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বহুল প্রতীক্ষিত “একক পর্যটন আইন” প্রণয়নের জন্য যে খসড়াটি তৈরী করেও শেষ মুহুর্তে শুধুমাত্র আমলাতন্ত্রের তেলেসমাতিতে আইনে পরিণত করা সম্ভব হয়নি তা এবার দেরী না করে সম্পন্ন করতে হবে; নাহয় সত্যিকার পর্যটন উন্নয়ন প্রচেষ্টা বরাবরের মত অধরাই থেকে যাবে।

পাঁচঃ দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে সবচেয়ে ক্ষিপ্র গতির শিল্প পর্যটনের জন্য বিশ-পচিশ বছর সামনে রেখে মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব। তাছাড়া মহাপরিকল্পনা নিয়ে আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা শুধুই হতাশার। তাই বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত এবং বিশেষ করে আমাদের পাশের দেশ শ্রীলঙ্কার ন্যায় তিন-চার বছরের জন্য “কৌশলগত পর্যটন পরিকল্পনা” বা ট্র্যাটেজিক ট্যুরিজম প্ল্যান (Strategic Tourism Planing) প্রণয়ন করে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং সময় ও অর্থ অপচয়ের যে মন্দ রীতি গড়ে উঠেছে তা নস্যাত করে দিতে হবে।

ছয়ঃ আর সময় নষ্ট না করে দ্রুত নির্ভূল মাঠ জরিপের মাধ্যমে পর্যটন সম্পদ ও সেবা সমূহ চিহ্নিত এবং স্তরীকরণ করে যথাযথ সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ দ্বারা পর্যটন পণ্যে রূপান্তর নিশ্চিত করার লক্ষে প্রয়োজনীয় সাধারণ অবকাঠামো এবং পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নের কাজকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি মানসম্পন্ন পর্যটন সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে “কোয়ালিটি ট্যুরিজম সার্ভিস” (QTS) পদ্ধতি চালু করতে হবে। এজন্য প্রয়োজনে স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা কাজে লাগাতে হবে যাতে সময় ক্ষেপণ (Time-wasting) এবং দায়িত্ব পালনে কালক্ষেপণ (Procrastination) নাহয়।

সাতঃ রূপান্তরিত পর্যটন পণ্যগুলোকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পণ্য সংকেতীকরণ বা প্রডাক্ট ব্র্যান্ডিং (Product Banding) দ্বারা আকর্ষণীয় ও যাথাযত নামকরণ সম্পন্ন শেষে অগ্রাধিকার নিরূপণের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট বাজার তথা টার্গেট মার্কেট (Target Market) চুড়ান্ত করতে হবে। তারপর সময় ক্ষেপণ না করে আধুনিক ও তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর বাজার ব্যবস্থাপনা কাজে লাগিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক ও কার্যকর প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে।

আটঃ তুলনামূলকভাবে আমাদের দেশে পর্যটন পণ্যের দাম বেশি এবং এজন্য পর্যটন সেবাগুলোর নিয়ন্ত্রণহীন চড়া দামই দায়ী। তাই এই সমস্যা দূর করার জন্য “কোয়ালিটি ট্যুরিজম সার্ভিস” (QTS) পদ্ধতি চালুর মাধ্যমে বিশেষ করে পর্যটন এলাকাগুলোতে সংকেতীকরণ ষ্টিকার ও তালিকাভূক্তি নিশ্চিত করে পর্যটকদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে মান সম্পন্ন সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। এতে অন্তত বিদেশি পর্যটকদের এবং বিশেষ করে বাজেট এবং ব্যাকপ্যাকার (Budget and Backpacker) পর্যটকদের সবচেয়ে বড় সমস্যাটি দূর হবে। তার সাথে বিদেশি এবং বিশেষ করে পর্যটন পণ্যের বাজার হিসেবে টার্গেট বা নিশানায় থাকা দেশগুলোর পর্যটকদের জন্য “ভিসা অন এরাইভাল এবং “ইলেক্ট্রনিক ভিসা” (Visa on Arrival – VoA & Electronic Visa – E-visa) প্রাপ্তি সহজ এবং নিশ্চিত করতে হবে।

নয়ঃ যে দেশে সঠিক পরিসংখ্যান এবং নির্ভরযোগ্য (Reliable) তথ্য-উপাত্ত নাই সে দেশে পর্যটন নাই। অথচ আমরা চলছি এগুলো ছাড়াই। তাই অনতিবিলম্বে জাতীয় পর্যটন তথ্য ভাণ্ডার বা “ন্যাশনাল ট্যুরিজম ডাটা বেস” (NTDA) এবং সঠিক ও আন্তর্জাতিক মানের পরিসংখ্যান নিশ্চিত করার লক্ষে “ট্যুরিজম স্যাটেলাইট একাউন্ট” (TSA) পদ্ধতি চালুর ব্যবস্থা করতে হবে। তার সাথে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যাবতীয় পর্যটন শিল্প সহায়ক সুবিধা এবং ওয়ান ষ্টপ সার্ভিস (OSS) সুবিধাসহ সাকূল্যে বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে হবে।

দশঃ এই শিল্পে মানব সম্পদ উন্নয়নের লক্ষে অনতিবিলম্বে “পর্যটন শিক্ষণ ও প্রশিক্ষণ উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ” (TETDRA) নামে একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করতে হবে। এটির কাজ হবে মূলত আধুনিক, দক্ষ এবং মান সম্পন্ন শিক্ষণ ও প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার লক্ষে সর্বোস্তরে পাঠ্যসূচী অনুমোদন, মান নিয়ন্ত্রণ, জাতীয় সনদপত্র প্রদান, কর্মসংস্থান, গবেষণা এবং তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ ইত্যাদি কর্ম সম্পাদন করা।

এগারোঃ প্রশাসন তথা আমলাতন্ত্রকে শৃঙ্খলিত করা না গেলে এবং বেসরকারি খাতের ভুঁইফোঁড় নেতৃত্বকে সামাল দেয়া না হলে অন্তত পর্যটন শিল্পে কোন উদ্যোগই সফলতার মূখ দেখবেনা। তাই সরকার প্রধানের নেতৃত্বে সরকারি বেসরকারি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে স্বল্প পরিসরের সর্বোচ্চ একটি “জাতীয় পর্যটন নীতি নির্ধারণী পর্ষদ” (NTPC) থাকতে হবে এবং পর্যটনের যেকোন বিষয়ে এই পর্ষদের সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত বলে গণ্য হবে। এর সদস্য শুধু তারাই হবেন যাদের বিস্তারিত  আমলনামা বা জীবন বৃত্তান্ত বিবেচনায় এই শিল্পে স্বীকৃত অবদান, দেশে-বিদেশে কর্মযজ্ঞ, গ্রহণযোগ্যতা, বয়স ও ব্যক্তিত্ব ইত্যাদি বিবেচনায় সবার উপরে স্থান পাবেন এবং এদের নিয়ে কোন রাজনৈতিক কিংবা ব্যক্তিক বিতর্ক থাকবেনা। মোদ্দাকথা, এখন থেকে বিশেষজ্ঞ তথা গুণীজন নির্বাচনের জন্য “বয়ান নয় প্রমাণ” হবে যোগ্যতার মাপকাটি।

বারোঃ বেসরকারিখাতকে শুধু মৌখিকভাবে উন্নয়ন সহযোগী না বলে বাস্তবে এবং সর্বোস্তরে এই খাতের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে যাতে কোথাও যেন রাজনৈতিক কিংবা ব্যক্তিক বিবেচনায় ভুঁইফোঁড় ও অযোগ্যরা আর জায়গা না পায়। বিশেষ করে নীতি নির্ধারণী কাজ এবং পরামর্শকের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিযুক্তি তথা দায়িত্ব প্রদানের জন্য বেসরকারি খাতের মধ্যে যারা দীর্ঘদিন ধরে দেশে-বিদেশে সার্বিকভাবে পর্যটন শিল্পে অবদান রেখেছেন তাদের বিস্তারিত জীবনবৃত্তান্ত, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, গ্রহণযোগ্যতা, বয়স ও ব্যক্তিত্ব ইত্যাদি যাচাই বাছাই করে এবং যেকোন বিতর্কের উর্দ্ধে থেকে অন্তত সর্বোচ্চ পর্যায়ে যে কয়েকজনকে পাওয়া যাবে তাদের চিহ্নিত এবং জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি তথা সম্মানিত করার মাধ্যমে ন্যাশনাল “ট্যুরিজম এলিট প্যানেল” (TEP) এর অন্তর্ভূক্ত করে রাখতে হবে। এতে তাদের সাথে সাথে পর্যটন শিল্প এবং জাতি উভয়েই সম্মানিত হবে; পাশাপাশি পর্যটনের যেকোন প্রয়োজনে এবং তাৎক্ষণিকভাবে তাদের অভিজ্ঞতা ও  দক্ষতা কাজে লাগানো যাবে।

সর্বসাকুল্যে অন্তত এই কাজগুলো করা গেলে পর্যটন এযাত্রায় যেমনি বিলিন হওয়া থেকে রক্ষা পাবে তেমনি নেতৃত্বগুণে উন্নয়নের ধারায় ফিরে আসবে। এজন্য সদাশয় সরকারকে আন্তরিকতার সাথে অনেকটা কঠিন হয়ে নেতৃত্বের হাল ধরতে  হবে। তবে সরকারি কিংবা বেসরকারি পর্যায়ের কোন অযোগ্য, অপদার্থ, মতলববাজ তথা ভুঁইফোঁড়কে আর যেন কোন অবস্থাতেই কোন স্তরে প্রবেশাধিকার দেয়া কিংবা রাজনৈতিক ও ব্যক্তিক আছরকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া না হয়। বিশেষ করে  আমলাতন্ত্র কর্তৃক আধিপত্য বিস্তার ও নোক্তা দেয়ার মাধ্যমে ফায়দা লুটা এবং জটিলতা সৃষ্টি করাকে যেকোনভাবে রহিত করতে হবে। তা নাহলে শেষতক আবারো সব উদ্যোগ আয়োজন জলে যাবে।

পরিশেষে, সার্বিক সাফল্য কামনা করে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে চাই, ইনশাল্লাহ “পরিকল্পনা” সামনে নিয়ে যাত্রা শুরু করা নতুন এই সরকার দেশ ও জাতির স্বার্থে জরুরীভাবে এসব কল্যাণকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে সম্ভাবনাময় পর্যটনকে তার উন্নয়নের ধারায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে। আর তখনই গোটা বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশও পর্যটন থেকে নানাভাবে উপকৃত হবে; সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) বৃদ্ধি পাবে এবং বিদেশে দেশের সুনাম বাড়বে।

 

লেখকঃ চেয়ারম্যান, সেন্টার ফর ট্যুরিজম স্টাডিজ (সিটিএস)