শাহাবুদ্দিন শুভ :: সমাজে এমন কিছু মানুষ থাকেন, যারা কেবল নিজের জন্য নয়, বরং অন্যের কল্যাণে নিবেদিত থাকেন। তারা মানবতার কথা ভাবেন, অসহায়দের পাশে দাঁড়ান। ঠিক তেমনই একজন মানবহিতৈষী নাসিমা ইসলাম। যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের অসহায় মানুষের জন্য তিনি গড়ে তুলেছেন ‘উইশ ফাউন্ডেশন’—একটি অলাভজনক সংস্থা, যা যুক্তরাজ্য সরকারের নিবন্ধিত এবং দুই দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
উইশ ফাউন্ডেশন যুক্তরাজ্যে হোমলেস, শরণার্থী ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য প্রতি সপ্তাহে বিনামূল্যে খাবার বিতরণ করে। প্রতি বৃহস্পতিবার লন্ডনের বিভিন্ন জায়গায় ফ্রি ফুড সেবা প্রদান করা হয়, যেখানে ১১ জন স্থায়ী কর্মী ও ২২ জন স্বেচ্ছাসেবক এই কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এ উদ্যোগের পরিধি দিন দিন বাড়ছে এবং আরও মানুষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। শুধু খাবার বিতরণই নয়, উইশ ফাউন্ডেশন তাদেরকে মানসিক ও সামাজিক সহায়তা প্রদান করে, যাতে তারা সমাজে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
উইশ ফাউন্ডেশন শুধুমাত্র খাদ্য সহায়তায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার উন্নয়নে কাজ করছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে জামিয়া ইসলামি দারুল কোরআন হাফিজিয়া মাদ্রাসা, মৈশাপুর মাদ্রাসা এবং মৌলভীবাজারের খেদমতুল কোরআন মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মধ্যে শীতবস্ত্র, খাবার ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া, বিধবা, বৃদ্ধ ও শীতার্তদের মাঝে কম্বল বিতরণ করা হয়। শিক্ষার্থীদের জন্য উন্নত খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে তারা পুষ্টিকর খাবার পেতে পারে। এছাড়াও, উইশ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্কুল ও মাদ্রাসা নির্মাণ করে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে। অতি সম্প্রতি উদ্ভোধন করা হবে বরগুনা জেলার আমতলী উপজেলার কালিবাড়ীতে উইশ ফাউন্ডেশন নুরানী মাদ্রাসা ও এতিমখানা।
নারীদের স্বনির্ভর করতে উইশ ফাউন্ডেশন বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও সহায়তা প্রদান করছে। বিভিন্ন স্থানে সেলাই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। পাশাপাশি, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে সংস্থাটি। বিশেষ করে, ২০২৩ সালে সিলেটের ভয়াবহ বন্যার সময় তারা বানভাসী মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ করেছে। এছাড়াও, বন্যার পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে সহায়তা করা হয়েছে।
উইশ ফাউন্ডেশন শুধু যুক্তরাজ্যে নয়, বাংলাদেশেও বেশকিছু কার্যক্রম পরিচালনা করছে। মাদ্রাসা নির্মাণ, ধর্মীয় শিক্ষা উপকরণ প্রদান, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের খাবার বিতরণ, অসহায়দের জন্য ঘর নির্মাণ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে সহায়তা প্রদান উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে, শীতকালীন সময়ে শীতপ্রবণ এলাকাগুলোতে শীতবস্ত্র বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এছাড়াও, উইশ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করে, যেখানে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা ও ওষুধ বিতরণ করা হয়।
টাওয়ার হ্যামলেট কাউন্সিলের সহযোগিতায় উইশ ফাউন্ডেশন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি শিক্ষা সফরের আয়োজন করেছিল, যেখানে ছাত্র-ছাত্রী এবং তাদের অভিভাবকদের ক্যাম্পাস ঘুরিয়ে দেখানো হয়। এই উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখার সুযোগ করে দিয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের মধ্য থেকে যদি কিছু শিক্ষার্থী ক্যামব্রিজে পড়ার সুযোগ পায়, তবে এটি একটি বড় সাফল্য হবে। এছাড়াও, উইশ ফাউন্ডেশন যুক্তরাজ্যে বসবাসরত শরণার্থী ও অভিবাসী পরিবারগুলোর জন্য বিভিন্ন শিক্ষামূলক কর্মশালার আয়োজন করে, যা তাদের নতুন জীবনে অভ্যস্ত হতে সাহায্য করে।
নাসিমা ইসলাম আলোচনার বাইরে থাকতে পছন্দ করলেও তাঁর ও উইশ ফাউন্ডেশনের কাজ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৭ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে তিনি টাওয়ার হ্যামলেট আনসাং হিরো পুরস্কারে সম্মানিত হন। এই পুরস্কার তাঁর নিরলস পরিশ্রম ও মানবসেবার প্রতি অবদানের স্বীকৃতি। এছাড়াও, উইশ ফাউন্ডেশনের কাজ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও স্থানীয় সরকারের প্রশংসা অর্জন করেছে।
মানুষের জন্য কাজ করাও আমার স্বপ্ন, তবে এভাবে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারিনি। দেড় যুগেরও বেশী সময় ধরে চিনি নাসিমা ইসলামকে তাই আমার বিশ্বাস উইশ ফাউন্ডেশনক যেভাবে মানবতার কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছেন, আশা করি এটি আমৃত্যু অব্যাহত থাকবে। মানবসেবার এই অনন্য উদ্যোগ সমাজের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। উইশ ফাউন্ডেশনের মতো সংস্থাগুলোই আমাদের বিশ্বাস রাখতে শেখায় যে, একটু সহানুভূতি ও সহযোগিতা দিয়ে আমরা এই পৃথিবীকে আরও সুন্দর ও মানবিক করে তুলতে পারি।